অতিরিক্ত সাদা স্রাব হলে করনীয় কি
নারীদের স্বাস্থ্যের একটি স্বাভাবিক অংশ হলো সাদা স্রাব (Leucorrhea)। এটি শরীরকে
পরিষ্কার রাখতে এবং জরায়ুর সংক্রমণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। তবে যখন এই স্রাব
অতিরিক্ত হয়, তখন তা অস্বস্তি এবং দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আপনার জন্য অতিরিক্ত সাদা স্রাব ও এর প্রতিকার নিয়ে একটি বিস্তারিত আর্টিকেল
নিচে দেওয়া হলো:
পেজ সূচিপত্র:অতিরিক্ত সাদা স্রাব হলে করনীয় কি
- সাদা স্রাব সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা
- স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক স্রাবের পার্থক্য
- অতিরিক্ত স্রাব হওয়ার প্রধান কারণসমূহ
- ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার উপায়
- সঠিক অন্তর্বাস নির্বাচনের গুরুত্ব
- খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির ভূমিকা
- ঘরোয়া প্রতিকার ও সমাধান
- মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার প্রভাব
- কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
- দীর্ঘমেয়াদী সচেতনতা ও প্রতিরোধ
- উপসংহার
১. সাদা স্রাব সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা
নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক অংশ হলো সাদা স্রাব।
এটি মূলত জরায়ু এবং যোনিপথ থেকে নির্গত এক ধরনের তরল যা যোনিপথকে পরিষ্কার
ও আর্দ্র রাখে। সাধারণত ঋতুচক্রের বিভিন্ন সময়ে এর পরিমাণ বা ঘনত্বে
পরিবর্তন আসতে পারে। স্বাভাবিক স্রাব সাধারণত স্বচ্ছ বা সামান্য সাদাটে এবং
গন্ধহীন হয়ে থাকে। যদি এটি অতিরিক্ত পরিমাণে হয় এবং সাথে অন্য কোনো
অস্বস্তি থাকে তবেই চিন্তার বিষয়। এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বের
করে দিতে সাহায্য করে। তাই সামান্য সাদা স্রাব দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই।
তবে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করলে সচেতন হওয়া জরুরি।
২. স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক স্রাবের পার্থক্য
স্বাভাবিক সাদা স্রাব পাতলা, পিচ্ছিল এবং কোনো ধরনের দুর্গন্ধমুক্ত হয়ে
থাকে। কিন্তু স্রাব যদি অতিরিক্ত ঘন, দইয়ের মতো চাকা চাকা বা ফেনার মতো হয়
তবে তা অস্বাভাবিক। রঙের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে যেমন ধূসর,
সবুজ বা হলুদ রঙের স্রাব। অস্বাভাবিক স্রাবের সাথে সাধারণত যোনিপথে চুলকানি
বা জ্বালাপোড়া অনুভব হতে পারে। এছাড়া অনেক সময় এর থেকে তীব্র আঁশটে বা পচা
গন্ধ বের হতে পারে। প্রস্রাবের সময় ব্যাথা বা তলপেটে অস্বস্তিও অস্বাভাবিক
স্রাবের লক্ষণ হতে পারে। তাই এই পার্থক্যগুলো বুঝে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা
প্রয়োজন।
৩. অতিরিক্ত স্রাব হওয়ার প্রধান কারণসমূহ
অতিরিক্ত সাদা স্রাব হওয়ার পেছনে বেশ কিছু শারীরিক ও বাহ্যিক কারণ থাকতে
পারে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব বা যোনিপথের ব্যাকটেরিয়াল ভারসাম্য নষ্ট
হওয়া এর অন্যতম কারণ। ইস্ট্রোজেন হরমোনের আধিক্য বা হরমোনাল পরিবর্তনের
কারণেও স্রাবের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া ছত্রাক সংক্রমণ বা ইস্ট
ইনফেকশন হলে স্রাব অনেক বেড়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ ভেজা অন্তর্বাস পরে থাকা বা
অপরিষ্কার পানি ব্যবহার করাও একটি বড় কারণ। জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল বা নির্দিষ্ট
কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এমনটি হতে পারে। মানসিক দুশ্চিন্তা এবং
পুষ্টির অভাবও অনেক সময় শরীরের এই নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়।
৪. ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার উপায়
সাদা স্রাবের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প
নেই। প্রতিদিন অন্তত দুইবার যোনিপথ পরিষ্কার পানি দিয়ে ধোয়া উচিত।
পরিষ্কার
করার সময় সামনে থেকে পেছনের দিকে পানি ব্যবহার করা জরুরি। তবে অতিরিক্ত
সাবান বা সুগন্ধিযুক্ত ক্লিনজার ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ
এগুলো যোনিপথের প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে ইনফেকশন বাড়িয়ে দেয়।
গোসলের পর বা টয়লেট ব্যবহারের পর জায়গাটি ভালো করে শুকিয়ে নিতে হবে।
মাসিকের সময় দীর্ঘক্ষণ একই প্যাড ব্যবহার না করে নিয়মিত পরিবর্তন করতে হবে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
৫. সঠিক অন্তর্বাস নির্বাচনের গুরুত্ব
অন্তর্বাস নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুতি কাপড়কে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া
উচিত। সিনথেটিক বা সিল্কের অন্তর্বাস বাতাস চলাচলে বাধা দেয় এবং আর্দ্রতা
ধরে রাখে। ফলে জমানো ঘাম ও গরমে ব্যাকটেরিয়া এবং ফাঙ্গাস দ্রুত বংশবিস্তার
করতে পারে। খুব বেশি টাইট বা আঁটসাঁট অন্তর্বাস পরা এড়িয়ে চলা স্বাস্থ্যের
জন্য ভালো। ভেজা বা স্যাঁতসেঁতে অন্তর্বাস কখনোই ব্যবহার করা উচিত নয়, তা
রোদ্রে শুকানো প্রয়োজন। রাতে ঘুমানোর সময় ঢিলেঢালা পোশাক পরা শরীরকে
স্বস্তিতে রাখতে সাহায্য করে। অন্তর্বাস ধোয়ার সময় কড়া ডিটারজেন্ট ব্যবহার
না করে মাইল্ড সোপ ব্যবহার করা ভালো। নিয়মিত অন্তর্বাস পরিবর্তন করলে
যোনিপথের সংক্রমণ অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব হয়।
৬. খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির ভূমিকা
অতিরিক্ত সাদা স্রাব রোধে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় টক দই রাখা খুব উপকারী কারণ এতে
প্রোবায়োটিক থাকে। প্রোবায়োটিক শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে
প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখে। প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা উচিত যা শরীর
থেকে টক্সিন বের করে দেয়। ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফলমূল এবং শাকসবজি শরীরের রোগ
প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার এবং ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা
ভালো কারণ এগুলো ইনফেকশন বাড়াতে পারে। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করলে শরীর ভেতর
থেকে শক্তিশালী হয় এবং সংক্রমণ কমে। সঠিক পুষ্টির অভাবেও অনেক সময় শরীরের
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে স্রাব বাড়ে।
৭. ঘরোয়া প্রতিকার ও সমাধান
হালকা সাদা স্রাবের সমস্যায় কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
প্রতিদিন এক গ্লাস পানিতে অল্প মেথি ভিজিয়ে রেখে সেই পানি পান করলে উপকার
পাওয়া যায়। ধনে বীজ ভিজিয়ে রাখা পানিও সাদা স্রাব নিয়ন্ত্রণে বেশ কার্যকর
বলে মনে করা হয়। অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার মিশ্রিত পানি দিয়ে বাইরের অংশ
পরিষ্কার করলে পিএইচ ব্যালেন্স ঠিক থাকে। এছাড়া প্রতিদিন এক কোয়া কাঁচা
রসুন খেলে শরীরের ছত্রাক সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সহজ হয়। ভাতের মাড় বা আমলকীর
গুঁড়ো খাওয়াও অনেক ক্ষেত্রে ঐতিহ্যগত প্রতিকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে মনে
রাখতে হবে ঘরোয়া প্রতিকার কেবল সামান্য সমস্যার জন্য কার্যকর। সমস্যা
গুরুতর হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।
৮. মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার প্রভাব
অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং ক্লান্তি সাদা স্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
অনিয়মিত জীবনযাপন এবং অপর্যাপ্ত ঘুম হরমোনের ভারসাম্যে ব্যাঘাত ঘটায়।
নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন ভালো থাকে এবং হরমোন
স্থিতিশীল হয়। ধূমপান এবং মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করা শরীরের
সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন। দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে না থেকে
মাঝেমধ্যে চলাফেরা করা উচিত। মানসিক প্রশান্তির জন্য ইয়োগা বা মেডিটেশন
চর্চা করা ইতিবাচক ফল দিতে পারে। শরীরের ওপর বেশি চাপ না দিয়ে পর্যাপ্ত
বিশ্রাম নেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। সুস্থ জীবনধারা বজায় রাখলে প্রজনন
সংক্রান্ত জটিলতাগুলো অনেকটাই কমে আসে।
৯. কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
সব সাদা স্রাবই ভয়ের কারণ নয়, তবে কিছু লক্ষণ দেখলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া
উচিত। যদি স্রাবের রঙ ধূসর, সবুজ বা হলদেটে হয় তবে দেরি করা ঠিক নয়। স্রাব
থেকে যদি দুর্গন্ধ বের হয় বা যোনিপথে অসহ্য চুলকানি হয় তবে তা ইনফেকশন।
প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা তলপেটে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা থাকলেও ডাক্তার
দেখাতে হবে। সহবাসের সময় ব্যথা অনুভব করা বা স্রাবের সাথে রক্ত দেখা দিলে
তা সিরিয়াস হতে পারে। নিজে নিজে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা ক্রিম ব্যবহার করা
একদমই উচিত নয়। একজন গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করিয়ে সঠিক
চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণ জরায়ু পর্যন্ত
ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
১০. দীর্ঘমেয়াদী সচেতনতা ও প্রতিরোধ
সাদা স্রাবের সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে সচেতনতাই হলো সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
বছরে অন্তত একবার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা চেকআপ করানো ভালো। নিজের
শরীরের পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করুন এবং অস্বাভাবিক কিছু মনে হলে নোট করুন।
ইনফেকশন থাকা অবস্থায় শারীরিক সম্পর্ক এড়িয়ে চলা উচিত যাতে পার্টনার
সংক্রমিত না হয়। বাজারচলতি ভ্যাজাইনাল ওয়াশ বা ডুশ ব্যবহার করার আগে এর
ক্ষতিকর দিক ভাবুন। সবসময় সুতির কাপড় ব্যবহার এবং শুকনো থাকার চেষ্টা বজায়
রাখুন। সঠিক তথ্য জানা থাকলে অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া
যায়। সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য নিজের গোপনাঙ্গের যত্ন নেওয়া লজ্জার নয়
বরং সচেতনতা।
১১.উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সাদা স্রাব কোনো রোগ নয় বরং এটি শরীরের একটি সংকেত।
সামান্য সচেতনতা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন এই সমস্যা থেকে আপনাকে দূরে
রাখতে পারে। তবে শরীর যখন স্বাভাবিকের বাইরে কোনো লক্ষণ দেখায়, তখন লজ্জা না
পেয়ে সঠিক পরামর্শ নেওয়া এবং নিজের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সুস্থ নারীই
একটি সুস্থ পরিবারের ভিত্তি, তাই নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা নয়—সচেতনতাই
হোক প্রথম পদক্ষেপ।



এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url