ঘুমের মধ্যে লালা ঝরার কারণ ও প্রতিকার
ঘুমের মধ্যে বালিশ ভিজে যাওয়া বা মুখ থেকে লালা ঝরা (Drooling) খুব সাধারণ একটি
বিষয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে 'সিয়ালোনিয়া' (Sialorrhea) বলা হয়। যদিও এটি
কোনো বড় রোগ নয়, তবে অনেক সময় এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যার সংকেত হতে
পারে।
নিচে ঘুমের মধ্যে লালা ঝরার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে একটি বিস্তারিত আর্টিকেল দেওয়া
হলো:
পেজ সূচিপত্রঃঘুমের মধ্যে লালা ঝরার কারণ ও প্রতিকার
- লালা ঝরার প্রাথমিক ধারণা ও মুখভঙ্গি
- শোয়ার পজিশন বা ঘুমানোর ভঙ্গি
- নাক বন্ধ থাকা বা সাইনাসের সমস্যা
- টনসিল ও গলা ব্যথার প্রভাব
- গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD)
- নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- স্লিপ অ্যাপনিয়া ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা
- স্নায়বিক সমস্যা বা নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার
- ঘরোয়া প্রতিকার ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন
- কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত
১. লালা ঝরার প্রাথমিক ধারণা ও মুখভঙ্গি
ঘুমের মধ্যে লালা ঝরা একটি সাধারণ শারীরিক প্রক্রিয়া হলেও অনেকের কাছে এটি
অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণত আমরা যখন জেগে থাকি, তখন মুখ গহ্বরে উৎপন্ন
লালা অবচেতনভাবেই গিলে ফেলি। কিন্তু গভীর ঘুমের সময় আমাদের মুখের পেশিগুলো
সম্পূর্ণ শিথিল হয়ে যায় এবং গিলার প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। ফলে
অতিরিক্ত লালা গিলে ফেলার পরিবর্তে ঠোঁটের কোণ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করে।
বিশেষ করে যারা হাঁ করে ঘুমান, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি অনেক বেশি প্রকট আকারে
দেখা দেয়। এটি মূলত শরীরের একটি বিশ্রামের বহিঃপ্রকাশ হলেও মাঝে মাঝে অন্য
সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। নিয়মিত লালা ঝরলে বালিশ ভিজে গিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি
হয় যা ত্বকেরও ক্ষতি করতে পারে।
২. শোয়ার পজিশন বা ঘুমানোর ভঙ্গি
আমাদের ঘুমানোর ভঙ্গির ওপর লালা ঝরা অনেকটা নির্ভর করে যা অনেকেই গুরুত্ব দিতে
চান না। যারা মূলত পাশ ফিরে বা উপুড় হয়ে ঘুমান, তাদের ক্ষেত্রে মাধ্যাকর্ষণ
শক্তির প্রভাবে লালা ঝরে। উপুড় হয়ে ঘুমালে মুখ নিচের দিকে থাকে বলে লালা মুখে জমে
না থেকে সরাসরি বালিশে পড়ে। উল্টোদিকে, চিত হয়ে ঘুমালে লালা গলার পেছনের দিকে চলে
যায় এবং তা স্বাভাবিকভাবে ভেতরে চলে যায়। তাই শোয়ার পজিশন পরিবর্তন করলে অনেক
ক্ষেত্রে এই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া সম্ভব হতে পারে। বালিশের উচ্চতা সঠিক
না হলেও লালা ঝরার প্রবণতা অনেক সময় বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করা হয়।
৩. নাক বন্ধ থাকা বা সাইনাসের সমস্যা
নাক দিয়ে শ্বাস নিতে সমস্যা হলে মানুষ সাধারণত মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে
থাকে। সাইনাস ইনফেকশন, সর্দি-কাশি বা অ্যালার্জির কারণে নাক বন্ধ থাকলে ঘুমের
মধ্যে মুখ খোলা থাকে। যখন মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া হয়, তখন মুখ গহ্বর শুকিয়ে যায় এবং
শরীর বেশি লালা উৎপন্ন করে। এই অতিরিক্ত লালা মুখ খোলা থাকার কারণে বাইরে গড়িয়ে
পড়ে যা বালিশ ভেজানোর প্রধান কারণ। দীর্ঘস্থায়ী সাইনাসের সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞ
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে কারণ এটি শ্বাসকষ্টও বাড়ায়। নাক পরিষ্কার
রেখে ঘুমাতে গেলে এই সমস্যা থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া সম্ভব হতে পারে বলে
ডাক্তাররা বলেন।
৪. টনসিল ও গলা ব্যথার প্রভাব
গলার ভেতরের কোনো সমস্যা বা টনসিল ফুলে গেলে লালা গিলতে প্রচণ্ড শারীরিক কষ্ট
অনুভব হয়। টনসিল বড় হয়ে গেলে তা গলার পথকে কিছুটা সংকীর্ণ করে দেয় যা লালা চলাচলে
বাধা দেয়। এর ফলে ঘুমের মধ্যে যখন আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তখন লালা গিলে ফেলা
কঠিন হয়ে পড়ে। ইনফ্লামেশন বা প্রদাহের কারণে লালা গ্রন্থিগুলোও স্বাভাবিকের চেয়ে
অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে তখন। শিশুদের ক্ষেত্রে টনসিলের সমস্যা লালা ঝরার
অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ডাক্তাররা চিহ্নিত করে থাকেন নিয়মিত। সময়মতো টনসিলের
চিকিৎসা না করালে এটি দীর্ঘমেয়াদী ঘুমের সমস্যা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার দিকে নিয়ে
যেতে পারে।
৫. গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD)
এসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার কারণেও ঘুমের মধ্যে লালা ঝরার সমস্যা সৃষ্টি
হতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। পাকস্থলীর এসিড যখন খাদ্যনালী দিয়ে উপরের দিকে
উঠে আসে, তখন মুখ গহ্বরকে রক্ষা করতে শরীর বেশি লালা নিঃসরণ করে। একে চিকিৎসা
বিজ্ঞানের ভাষায় 'ওয়াটার ব্রাশ' বলা হয় যা ঘুমের মধ্যে লালা ঝরার কারণ হয়ে
দাঁড়ায়। রাতের বেলা ভারি খাবার খেলে বা খাওয়ার সাথে সাথেই শুয়ে পড়লে এই রিফ্লাক্স
হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। হজমের সমস্যা থাকলে লালার ঘনত্ব এবং পরিমাণ উভয়ই বেড়ে যেতে
পারে যা ঘুমের সময় অস্বস্তি বাড়ায়। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং সঠিক সময়ে ডিনার
করলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
৬. নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
শারীরিক কোনো অসুস্থতার জন্য নেওয়া নিয়মিত ওষুধের প্রভাবেও অনেক সময় অতিরিক্ত
লালা উৎপাদিত হতে পারে সারাদিন। বিশেষ করে মানসিক রোগের ওষুধ, অ্যালঝাইমার্সের
ওষুধ বা কিছু কড়া অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে এটি হতে পারে। এসব
ওষুধ লালা গ্রন্থিকে অতিমাত্রায় উত্তেজিত করে তোলে যার ফলে ঘুমের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ
থাকে না। যদি নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর এই সমস্যা দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের
সাথে কথা বলা উচিত। শরীর ওষুধের সাথে মানিয়ে নিলে অনেক সময় লালা ঝরা নিজে থেকেই
বন্ধ হয়ে যায় কয়েক দিন পর। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই জীবন
রক্ষাকারী ওষুধ বন্ধ করা একদমই উচিত হবে না।
৭. স্লিপ অ্যাপনিয়া ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা
স্লিপ অ্যাপনিয়া এমন একটি গুরুতর সমস্যা যেখানে ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস থমকে
যায় বা বাধা পায়। এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখ দিয়ে জোরে
জোরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করেন ঘুমের ঘোরে। মুখ খোলা থাকার কারণে লালা শুকিয়ে যায়
এবং শরীর তা পূরণে অতিরিক্ত লালা তৈরি করতে থাকে। এটি শুধু লালা ঝরা নয়, বরং
হৃদরোগের ঝুঁকির সাথেও সরাসরি যুক্ত থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। যারা খুব জোরে
নাক ডাকেন এবং সকালে উঠে ক্লান্তি অনুভব করেন, তাদের লালা ঝরার সমস্যা থাকতে
পারে। এই ধরনের লক্ষ্মণ দেখা দিলে দ্রুত স্লিপ স্টাডি বা বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন
হওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে ধরা হয়।
৮. স্নায়বিক সমস্যা বা নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার
শরীরের স্নায়বিক কোনো জটিলতা থাকলে পেশির ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায় যা লালা ঝরার
কারণ হতে পারে। পার্কিনসন্স ডিজিজ, সেরেব্রাল পালসি বা স্ট্রোকের পর রোগীদের লালা
গিলার পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। স্নায়ুর সমস্যার কারণে মস্তিষ্ক
ঠিকমতো সংকেত পাঠাতে পারে না যে লালা মুখে জমে আছে কি না। এর ফলে লালা মুখ থেকে
অনবরত বেরিয়ে আসে যা রোগীর জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সঠিক থেরাপি
এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে পেশির নিয়ন্ত্রণ কিছুটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে এই
ধরনের ক্ষেত্রে। বিশেষজ্ঞ নিউরোলজিস্টের অধীনে চিকিৎসা নিলে এই ধরনের সমস্যার
মাত্রা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়ে থাকে।
৯. ঘরোয়া প্রতিকার ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন
জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তন এনে ঘুমের মধ্যে লালা ঝরার এই সমস্যাটি
অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রচুর পরিমাণে পানি পান করলে লালা পাতলা থাকে এবং তা
গিলতে শরীরের জন্য অনেক সহজ হয়। শোয়ার আগে লেবু বা টক জাতীয় ফল খেলে লালা উৎপাদন
সাময়িকভাবে কমে আসতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। ধূমপান এবং মদ্যপান এড়িয়ে চললে
মুখের ভেতরের পরিবেশ সুস্থ থাকে এবং লালা ঝরা হ্রাস পায় কার্যকরভাবে। এছাড়া রাতে
ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করার অভ্যাস করা উচিত।
নিয়মিত শরীরচর্চা এবং নাক পরিষ্কার রাখার অভ্যাস করলে ঘুমের মান উন্নত হয় এবং
অস্বস্তি দূর হয়।
১০. কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত
যদি লালা ঝরার সমস্যা প্রতিদিনের ঘটনায় পরিণত হয় এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, তবে
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত লালার সাথে যদি দুর্গন্ধ, রক্ত বা
শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা থাকে, তবে তা অবহেলা করা ঠিক নয়। দন্তচিকিৎসক বা
নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে এর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা খুব সহজ হতে পারে
এখনকার দিনে। অনেক সময় স্পিচ থেরাপি বা ছোটখাটো চিকিৎসার মাধ্যমে এই সমস্যার
স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হয়ে থাকে সহজে। বালিশ বা বিছানা নিয়মিত পরিষ্কার রাখা
এবং স্বাস্থ্যকর ঘুমের পরিবেশ তৈরি করা সুস্থতার প্রথম ধাপ হিসেবে ধরা হয়। সুস্থ
থাকতে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই, তাই নিজের শরীরের ছোটখাটো পরিবর্তনগুলো সবসময়
গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করুন।



এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url