অবিবাহিত মেয়েদের সাদা স্রাব কেন হয়




অবিবাহিত মেয়েদের সাদা স্রাব হওয়া একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং জৈবিক প্রক্রিয়া। তবে অনেক সময় সচেতনতার অভাবে এটি নিয়ে তরুণীদের মনে নানা ভয় বা দ্বিধা কাজ করে এই বিষয়ে আমাদের অনেকেরই অজানা তাই আমাদের সবারই এই বিষয়ে জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ আমাদের আর্টিকেলে আজকে এ বিষয়ে সব কিছু বিস্তারিত দেওয়া আছে
অবিবাহিত মেয়েদের সাদা স্রাব কেন হয়
আজকের এই আর্টিকেলটি শুধু আপনাদের জন্য তাহলে চলুন আজকে আমাদের এই আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে সবাই পড়তে থাকুন 

পেজ সূচিপত্রঃ অবিবাহিত মেয়েদের সাদা স্রাব কেন হয়

১. প্রাকৃতিক ও জৈবিক কারণসমূহ

মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালের পর থেকে শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাব বাড়তে থাকে। এই হরমোনের প্রভাবে যোনিপথের গ্রন্থিগুলো থেকে এক ধরনের তরল নিঃসৃত হয়। এটি যোনিপথকে পিচ্ছিল রাখে এবং ক্ষতিকর ইনফেকশন থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। ঋতুচক্রের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ ডিম্বস্ফোটন বা ওভুলেশনের সময় এই স্রাব বৃদ্ধি পায়। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং কোনো ওষুধের প্রয়োজন নেই এই সাধারণ অবস্থায়। শরীরের নিজস্ব পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার এটি একটি প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে কাজ করে। স্বাভাবিক স্রাব সাধারণত স্বচ্ছ, পাতলা এবং গন্ধহীন হয়ে থাকে যা উদ্বেগের নয়। তাই অবিবাহিত মেয়েদের ভয়ের কিছু নেই যদি এটি স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে। সুস্থ শরীরের লক্ষণ হিসেবেই চিকিৎসকরা এই নিয়মিত নিঃসরণকে গণ্য করে থাকেন সবসময়।

২. হরমোনের ভারসাম্যহীনতার প্রভাব

শরীরে হরমোনের মাত্রার তারতম্য ঘটলে সাদা স্রাবের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তার কারণে হরমোন লেভেলে বিচ্যুতি ঘটে। অনিয়মিত পিরিয়ড বা ঋতুচক্রের সমস্যার কারণেও অনেক সময় এই সমস্যা দেখা দেয়। বয়ঃসন্ধিকালে শরীরের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে হরমোনগুলো স্থিতিশীল হতে বেশ সময় নেয়। থাইরয়েড বা অন্য কোনো এন্ডোক্রাইন সমস্যার কারণেও স্রাবের পরিবর্তন হতে পারে অনেক। সঠিক সময়ে পুষ্টিকর খাবার না খেলে হরমোনের এই ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। হরমোনের প্রভাবে জরায়ুর আস্তরণ এবং নিঃসরণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে নিয়মিত শরীরচর্চা এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হরমোন পরীক্ষা করলে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। হরমোনের সুষম অবস্থা বজায় থাকলে এই সাদা স্রাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে আসে।

৩. ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব

অবিবাহিত মেয়েদের ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সাদা স্রাবের প্রধান কারণ হতে পারে। অন্তর্বাস নিয়মিত পরিষ্কার না করা বা ভেজা কাপড় পরা ক্ষতিকর। যোনিপথের আশেপাশে অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকলে সেখানে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক জন্মায়। দীর্ঘক্ষণ অপরিষ্কার থাকা বা ঋতুস্রাবের সময় সঠিক স্যানিটারি ন্যাপকিন না ব্যবহার করা। সুতির অন্তর্বাস ব্যবহার না করে সিন্থেটিক কাপড় পরলে বাতাস চলাচল ব্যাহত হয়। সাবান বা সুগন্ধি জেল ব্যবহারের ফলে যোনিপথের পিএইচ (pH) ভারসাম্য নষ্ট হয়। সবসময় জায়গাটি শুকনো এবং পরিষ্কার রাখা স্রাব প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান উপায়। গোসলের পর ভালো করে শরীর শুকিয়ে নেওয়া এবং পরিষ্কার কাপড় পরা উচিত। অপরিচ্ছন্নতা কেবল সাদা স্রাব নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী জরায়ুর ইনফেকশন তৈরি করতে পারে। সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

৪. যোনিপথে ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন

সাদা স্রাব যদি দইয়ের মতো ঘন এবং চুলকানিযুক্ত হয়, তবে বুঝবেন ইনফেকশন। ক্যানডিডা অ্যালবিকানস নামক ছত্রাকের কারণে ভ্যাজাইনাল ইস্ট ইনফেকশন হতে দেখা যায়। এছাড়া ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস হলে স্রাব থেকে মাছের মতো কড়া দুর্গন্ধ বের হয়। পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক সময় জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে সহজে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে এই ধরনের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমণের ফলে প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা তলপেটে হালকা ব্যথা অনুভব হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলেও শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়া মারা গিয়ে ইনফেকশন বাড়ায়। এই অবস্থায় ঘরে বসে চিকিৎসা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি ডিম্বাশয় বা জরায়ুর অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসকের দেওয়া ক্রিম বা ওষুধ নিয়মিত ব্যবহার করলে দ্রুত সুস্থ হওয়া যায়।

৫. খাদ্যাভ্যাস এবং পুষ্টির ভূমিকা

অতিরিক্ত মিষ্টি বা শর্করা জাতীয় খাবার খেলে ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। পুষ্টিকর খাবারের অভাব শরীরকে দুর্বল করে দেয় যা সাদা স্রাব বাড়ায়।
অবিবাহিত মেয়েদের সাদা স্রাব কেন হয়
 পর্যাপ্ত পানি পান না করলে শরীর থেকে টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ বের হতে পারে না। ভিটামিন সি এবং প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার যেমন দই খাওয়া খুবই উপকারী। শাকসবজি এবং ফলমূল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত ফাস্টফুড হরমোনের ভারসাম্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে অনেক বেশি। রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া থাকলে অবিবাহিত মেয়েদের সাদা স্রাবের সমস্যা প্রকট হতে পারে। ক্যালসিয়াম এবং আয়রন সমৃদ্ধ খাবার হাড়ের এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়। নিয়মিত সুষম খাবার খেলে শরীরের পিএইচ ভারসাম্য বজায় থাকে এবং স্রাব কমে। সঠিক ডায়েট প্ল্যান মেনে চললে ওষুধ ছাড়াই অনেক শারীরিক সমস্যা দূর হয়।

৬. মানসিক চাপ ও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি

মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে শারীরিক নিঃসরণের এক গভীর এবং সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ বা পারিবারিক দুশ্চিন্তা থেকে হরমোন লেভেল পরিবর্তিত হয়। দুশ্চিন্তার কারণে শরীরে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায় যা প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শরীরকে ক্লান্ত করে দেয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়। দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা অনেক সময় শারীরিক উপসর্গ হিসেবে সাদা স্রাব সৃষ্টি করে। মনকে প্রফুল্ল রাখলে শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়। যোগব্যায়াম বা ধ্যানের মাধ্যমে মানসিক চাপ কমিয়ে এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো বা শখের কাজ করা মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে। শরীর এবং মনের সামঞ্জস্য থাকলে হরমোনাল নিঃসরণগুলো স্বাভাবিক সীমার মধ্যে থাকে। তাই সাদা স্রাব দূর করতে মানসিক প্রশান্তির কোনো বিকল্প নেই এই সময়ে।

৭. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য কারণ

জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল বা নির্দিষ্ট কিছু স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধের কারণে স্রাব বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদী অ্যান্টিবায়োটিক সেবন যোনিপথের স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। অনেক সময় কৃমির সংক্রমণের কারণেও মেয়েদের সাদা স্রাবের মতো সমস্যা দেখা দেয়। রক্তচাপের ওষুধ বা অন্য কোনো ক্রনিক রোগের চিকিৎসায় স্রাবের পরিবর্তন আসতে পারে। শরীরের ওজন হঠাৎ কমে গেলে বা বেড়ে গেলেও হরমোনের বিপর্যয় ঘটতে দেখা যায়। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ঘনঘন ছত্রাক সংক্রমণ এবং সাদা স্রাবের প্রবণতা বেশি থাকে। যোনিপথে কোনো রাসায়নিক স্প্রে বা সুগন্ধি ব্যবহার করলে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে শরীর সুরক্ষার জন্য অতিরিক্ত মিউকাস বা তরল উৎপাদন শুরু করে। কোনো নতুন ওষুধ শুরু করার পর এই সমস্যা হলে চিকিৎসককে জানানো উচিত। কোনো রাসায়নিক পণ্য ব্যবহারের আগে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।

৮. লক্ষণ কখন বিপজ্জনক হতে পারে

অবিবাহিত মেয়েদের সাদা স্রাব কেন হয়
সাদা স্রাব যদি ধূসর, সবুজ বা হলুদাভ বর্ণের হয় তবে সতর্ক হতে হবে। যদি স্রাবের সাথে অতিরিক্ত দুর্গন্ধ বা আঁশটে গন্ধ বের হতে থাকে। যোনিপথে তীব্র চুলকানি, লালচে ভাব বা জ্বালাপোড়া অনুভব করা মোটেও স্বাভাবিক নয়। প্রস্রাবের সময় তীব্র যন্ত্রণা বা বারবার প্রস্রাবের বেগ পাওয়া বিপদের লক্ষণ। স্রাব যদি চাকা চাকা বা অতিরিক্ত ঘন হয়ে বের হতে থাকে প্রতিনিয়ত। তলপেটে অসহ্য ব্যথা বা কোমরের নিচের দিকে টানা ব্যথা অনুভব করা। পিরিয়ডের সময় ছাড়াও যদি স্রাবের সাথে রক্ত দেখা যায় তবে জরুরি। শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা জ্বর আসলে বুঝবেন সংক্রমণ গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে লজ্জা না করে অভিভাবককে জানানো উচিত। সময়মতো রোগ নির্ণয় হলে জটিল অস্ত্রোপচার বা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।

৯. প্রতিকার ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন

প্রতিদিন অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য কুসুম গরম পানি এবং সামান্য লবণ ব্যবহার করা যেতে পারে। সুতির আরামদায়ক অন্তর্বাস ব্যবহার করুন এবং রাতে ঢিলেঢালা পোশাক পরে ঘুমান। চিনি এবং ময়দার তৈরি খাবার কমিয়ে ডায়েটে টক দই অন্তর্ভুক্ত করুন। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি বা হালকা ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন। পাবলিক টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা এবং পরিচ্ছন্ন থাকা। পিরিয়ডের সময় প্রতি ৬ ঘণ্টা অন্তর স্যানিটারি প্যাড পরিবর্তন করা জরুরি। কোনো বিশেষ সাবান বা ভ্যাজাইনাল ওয়াশ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করবেন না। শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম ও ঘুম নিশ্চিত করুন। সুস্থ জীবনধারা বজায় রাখলে সাদা স্রাবের মতো সাধারণ সমস্যা সহজেই এড়ানো যায়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, অবিবাহিত মেয়েদের সাদা স্রাব হওয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ঘটনা। এটি নিয়ে অহেতুক আতঙ্কিত না হয়ে বরং নিজের শরীরের প্রতি যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। সঠিক পুষ্টি, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখলে এই সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। তবে যদি স্রাবের ধরন অস্বস্তিকর হয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। লজ্জা বা সংকোচ এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। সঠিক জ্ঞান এবং সচেতনতাই পারে একজন নারীকে সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী রাখতে। নিজের শরীরকে জানুন এবং সুস্থ থাকার জন্য সঠিক অভ্যাসগুলো নিয়মিত পালন করুন।

 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url