বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে বায়ু প্রবাহজনিত ভূমিক্ষয় বেশি হয়
বাংলাদেশের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে বায়ু প্রবাহজনিত ভূমিক্ষয় বা Wind Erosion একটি
নির্দিষ্ট অঞ্চলে বেশ প্রকট। সাধারণত আমরা নদী ভাঙন নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকলেও,
উত্তরাঞ্চলের একটি বিস্তীর্ণ এলাকায় বায়ু প্রবাহ কৃষি ও মাটির উর্বরতার জন্য
হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আপনার জন্য বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে বায়ু প্রবাহজনিত ভূমিক্ষয় বেশি হয় এর ওপর
একটি বিস্তারিত আর্টিকেল নিচে দেওয়া হলো
পেজ সূচিপত্র:বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে বায়ু প্রবাহজনিত ভূমিক্ষয় বেশি হয়
- ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট ও মূল অঞ্চল
- জলবায়ু পরিবর্তন ও শুষ্ক মৌসুমের প্রভাব
- উদ্ভিজ্জ আচ্ছাদনের অভাব ও বনায়ন সংকট
- কৃষি পদ্ধতি ও ভুল চাষাবাদের প্রভাব
- উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুর ভূমিকা
- মাটির উর্বরতা হ্রাস ও পুষ্টি উপাদানের ক্ষয়
- আর্থ-সামাজিক প্রভাব ও কৃষক সমাজের সংকট
- পানি সংকট ও মরুকরণ প্রক্রিয়ার সংযোগ
- সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের অভাব
- ভবিষ্যৎ করণীয় ও টেকসই সমাধান
- উপসংহার
১. ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট ও মূল অঞ্চল
বাংলাদেশে সাধারণত সব অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয় সমানভাবে হয় না, বরং
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র ভূমি এবং উপকূলীয় চরাঞ্চলে এটি বেশি দেখা যায়।
বিশেষ করে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, এবং দিনাজপুর জেলার শুষ্ক এলাকাগুলো এই
সমস্যার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। শীতকাল এবং প্রাক-বর্ষা মৌসুমে যখন মাটি
একেবারে শুকিয়ে যায়, তখন প্রবল বাতাসের তোড়ে উপরের উর্বর স্তর উড়ে যেতে থাকে।
এই প্রক্রিয়ায় মাটির উপরিভাগের পুষ্টি উপাদানগুলো স্থানান্তরিত হয়ে যায়, যা
কৃষিজমির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি সাধন করে। উপকূলীয় দ্বীপগুলোতেও সমুদ্রের নোনা
বাতাসের প্রবল বেগে বালুকাণা উড়ে এসে আবাদি জমি নষ্ট করে ফেলে। মূলত মাটির গঠন
এবং উদ্ভিজ্জ আচ্ছাদনের অভাবেই এই অঞ্চলে বায়ুর প্রকোপ মাটির ওপর সরাসরি প্রভাব
ফেলে। শুষ্ক জলবায়ু এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে তোলে এবং মাটির কণাগুলোকে
আলগা করে দেয়। বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু-নিচু ভূপ্রকৃতি বাতাসকে কোনো বাধা প্রদান
করতে পারে না বলে সেখানে এর তীব্রতা অনেক বেশি। এই ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের
উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তের মাটির গুণাগুণ নষ্ট করার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরো পড়ুন:কোন পুকুরে ধানী পোনা ছাড়া হয়
২. জলবায়ু পরিবর্তন ও শুষ্ক মৌসুমের প্রভাব
বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয়ের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং
দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক মৌসুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশে
চৈত্র এবং বৈশাখ মাসে যখন তাপমাত্রা চরম থাকে, তখন মাটির আর্দ্রতা কমে গিয়ে
ধূলিকণায় পরিণত হয়। এই সময়ে কালবৈশাখী ঝড়ের প্রভাবে প্রচণ্ড বেগে বায়ু
প্রবাহিত হয় যা মাটির আলগা আস্তরণকে শত শত মাইল দূরে নিয়ে যায়। বৃষ্টিপাত কম
হওয়ায় মাটি শক্ত হয়ে জমাট বাঁধতে পারে না, ফলে সামান্য বাতাসেই তা
ক্ষয়প্রাপ্ত হতে শুরু করে। উত্তরবঙ্গে মরুপ্রক্রিয়া বা ডেজার্টিফিকেশন শুরু
হওয়ার পেছনে এই বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয়কে একটি প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয়।
পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাব এবং অতিরিক্ত উত্তাপ মাটির জৈব পদার্থ পুড়িয়ে ফেলে, যা
মাটির বাঁধন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে বাতাসের সামান্য ঝাপটাও মাটির উপরিভাগের
উর্বর অংশকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং চাষাবাদ কঠিন করে তোলে। জলবায়ুর
এই অস্থিরতা প্রতি বছর ভূমিক্ষয়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং মাটিকে চাষের
অনুপযুক্ত করে তুলছে প্রতিনিয়ত। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না
পারলে এই অঞ্চলের ভূমিক্ষয় রোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
৩. উদ্ভিজ্জ আচ্ছাদনের অভাব ও বনায়ন সংকট
কোনো অঞ্চলের ভূমিক্ষয় রোধে গাছপালা বা প্রাকৃতিক বনায়ন সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল
হিসেবে কাজ করলেও বরেন্দ্র অঞ্চলে এর অভাব প্রকট। বনভূমি উজাড় করার ফলে বাতাসের
গতিবেগ সরাসরি মাটির সংস্পর্শে আসে এবং মাটির উপরিভাগ সরিয়ে ফেলার সুযোগ পায়।
গাছের শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে, কিন্তু পর্যাপ্ত গাছ না থাকায় মাটির গঠন
শিথিল হয়ে পড়ে থাকে। যখন বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠ খালি অবস্থায় পড়ে থাকে, তখন
প্রবল বাতাস বিনা বাধায় মাটির ওপর দিয়ে বয়ে যেতে পারে। চারণভূমির অভাব এবং
ঘাসের অভাবও মাটির এই অরক্ষিত অবস্থার জন্য সমানভাবে দায়ী বলে গবেষকরা মনে করেন।
বনায়ন না থাকায় মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যায়, যা পরোক্ষভাবে
বায়ুর ক্ষয়কারী ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। যদি পরিকল্পিতভাবে বাতাসের গতিপথ
রোধ করার জন্য 'উইন্ড ব্রেক' বা গাছ লাগানো না হয়, তবে এই প্রকোপ কমবে না।
গাছপালা কম থাকায় বাতাসের ঘর্ষণ সরাসরি মাটির উপরিভাগে ঘটে, ফলে সূক্ষ্ম পলি ও
বালুকণা সহজেই স্থানচ্যুত হয়। এই বনায়ন সংকটই মূলত উত্তরবঙ্গের ভূমিক্ষয়কে
একটি জাতীয় সমস্যার পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছে বর্তমান সময়ে।
৪. কৃষি পদ্ধতি ও ভুল চাষাবাদের প্রভাব
প্রথাগত এবং অবৈজ্ঞানিক চাষাবাদ পদ্ধতি বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয়কে অনেক
ক্ষেত্রে ত্বরান্বিত করে এবং মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করে ফেলে। জমিতে ফসল কাটার পর
দীর্ঘ সময় ফেলে রাখা এবং মাটি অতিরিক্ত আলগা করে চাষ দেওয়া বায়ুর জন্য সুযোগ
তৈরি করে। ট্রাক্টর দিয়ে মাটি বেশি গভীর করে চাষ দিলে মাটির অভ্যন্তরীণ আর্দ্রতা
দ্রুত হারিয়ে যায় এবং ধুলোয় পরিণত হয়। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের কৃষকরা অনেক
সময় ফসল তোলার পর অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলে, যা মাটির জৈব বাঁধন নষ্ট করে দেয়।
মাটির এই আলগা ভাব বাতাসের ঝাপটায় উড়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত পরিস্থিতি
তৈরি করে দেয় প্রতিনিয়ত। শস্য পর্যায় বা ক্রপ রোটেশন ঠিকমতো না মানার কারণে
মাটির পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়, যা মাটিকে আরও শুষ্ক করে তোলে। জমিতে পর্যাপ্ত জৈব
সার ব্যবহার না করার ফলে মাটির কণাগুলো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সহজে উড়ে
যায়। কৃষি জমিতে ছায়া প্রদানকারী বড় গাছ না থাকায় বাতাসের প্রবাহ সরাসরি
মাটির ওপর আঘাত হেনে ক্ষয় সৃষ্টি করে। উন্নত ও বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ পদ্ধতির অভাব
এই অঞ্চলের ভূমিক্ষয় সমস্যার অন্যতম প্রধান কারিগরি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা
যায়।
৫. উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুর ভূমিকা
উপকূলীয় চরাঞ্চলগুলোতে বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয় একটু ভিন্ন প্রকৃতির হলেও তা
সমানভাবে ক্ষতিকর এবং কৃষি উৎপাদনের জন্য হুমকিস্বরূপ। সমুদ্র থেকে আসা লোনা
বাতাস বালুকাণা বহন করে নিয়ে আসে এবং তা উর্বর পলি মাটির ওপর জমা করে ফেলে। এর
ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের আবাদি জমিগুলো ধীরে ধীরে বালুকাময় হয়ে পড়ে এবং চাষাবাদের
অনুপযুক্ত হয়ে যায় দীর্ঘ সময়ের জন্য। উপকূলীয় বাঁধ বা বনায়ন না থাকলে
সমুদ্রের প্রবল বাতাস সরাসরি উপকূলে আঘাত হেনে মাটির উপরিভাগ তছনছ করে দেয়।
নোয়াখালী, ভোলা এবং পটুয়াখালীর বিভিন্ন দ্বীপে এই ধরনের বায়ুপ্রবাহজনিত
পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে যা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় এই
বায়ুর গতিবেগ এতই বেড়ে যায় যে তা মাটির উপরিভাগের কয়েক ইঞ্চি স্তর সহজেই
সরিয়ে ফেলে। লোনা বালুর আধিক্য মাটির অম্লতা বাড়িয়ে দেয় এবং স্থানীয়
উদ্ভিদের বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। চরাঞ্চলের
বালুচরগুলোতে ঘাস বা লতাগুল্ম না থাকায় বাতাস সহজেই বালু উড়িয়ে নিয়ে বসতি ও
ফসলি জমি ভরাট করে। এই সমস্যা উপকূলের জনজীবন ও জীবিকার ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী
নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যা নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
৬. মাটির উর্বরতা হ্রাস ও পুষ্টি উপাদানের ক্ষয়
বায়ুপ্রবাহের ফলে মাটির সবচেয়ে উর্বর অংশ অর্থাৎ 'টপ সয়েল' বা উপরিভাগের
স্তরে থাকা জৈব উপাদানগুলো হারিয়ে যায়। এই উপরিভাগেই সাধারণত নাইট্রোজেন,
ফসফরাস এবং পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানগুলো ঘনীভূত অবস্থায় জমা
থাকে ফসলের জন্য। যখন বাতাস এই সূক্ষ্ম কণাগুলো উড়িয়ে নিয়ে যায়, তখন মাটির
গঠন হয়ে পড়ে বালুকাময় এবং খনিজ উপাদানহীন এক মরুভূমি। সার প্রয়োগ করলেও
উর্বরতা ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে কারণ মাটির ধারণ ক্ষমতা তখন একেবারেই কমে
যায়। উর্বরতা হ্রাসের ফলে ফসলের উৎপাদনশীলতা প্রতি বছর কমতে থাকে, যা কৃষকদের
অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে অনেক বেশি। পুষ্টিহীন মাটিতে গাছের শিকড়
শক্তভাবে বসতে পারে না, ফলে বাতাস বা বৃষ্টির প্রভাবে পরবর্তী ক্ষয় আরও সহজ হয়।
এটি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়ার মতো কাজ করে যা মাটিকে ক্রমাগত মৃতপ্রায় করে তোলে
এবং উৎপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই পুষ্টি উপাদানের
ক্ষয় একটি বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশে। মাটির স্বাস্থ্য
পুনরুদ্ধারের জন্য জৈব সারের ব্যাপক ব্যবহার এবং বায়ু নিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ করা
এখন সময়ের দাবি।
৭. আর্থ-সামাজিক প্রভাব ও কৃষক সমাজের সংকট
বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয় কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর
আর্থ-সামাজিক সংকট যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। যখন ফসলি জমির
উর্বরতা কমে যায়, তখন কৃষকদের জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হয় এবং ঋণের বোঝা
বাড়তে থাকে। উত্তরবঙ্গের অনেক প্রান্তিক কৃষক তাদের জমি চাষ অনুপযোগী হয়ে
পড়ায় পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলন কম হওয়ায় বাজারে
খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা
তৈরি হয়। এই ভূমিক্ষয় কবলিত অঞ্চলের মানুষেরা প্রায়ই কাজের সন্ধানে শহরে
অভিবাসন করতে বাধ্য হয় যা সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের
ওপর ব্যয় করার মতো উদ্বৃত্ত অর্থ কৃষকদের হাতে থাকে না নিম্ন ফলনের কারণে।
ভূমিক্ষয়ের ফলে কৃষি জমি নষ্ট হওয়ায় জমির মূল্য কমে যায় এবং গ্রামীণ সম্পদ
হ্রাস পেতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে দারিদ্র্য বিমোচন
কর্মসূচিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বৈষম্য আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। তাই সরকারি ও
বেসরকারি পর্যায়ে এই সমস্যার সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে বৃহত্তর
জনস্বার্থ রক্ষায়।
৮. পানি সংকট ও মরুকরণ প্রক্রিয়ার সংযোগ
বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয়ের সাথে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার এক গভীর ও
অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে উত্তরবঙ্গে। যখন মাটির উপরিভাগ বাতাস দ্বারা
ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তখন মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা অর্ধেকের বেশি কমে যায়
স্বাভাবিকভাবে। শুকনো মাটি থেকে পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে যায়, যার ফলে উদ্ভিদ
প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা পায় না এবং মারা যায়। বরেন্দ্র অঞ্চলে অতিরিক্ত পানি
উত্তোলনের ফলে মাটি আরও শুষ্ক হয়ে পড়ে, যা বায়ুপ্রবাহজনিত ক্ষয়কে আরও সহজতর
করে তোলে। এই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদে মরুকরণ বা ডেজার্টিফিকেশনের দিকে ধাবিত
হচ্ছে যা পরিবেশবিদদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানির স্তর নিচে
নেমে যাওয়ায় মাটিতে ফাটল ধরে এবং বাতাসের ক্রিয়া সেই ফাটলগুলোকে আরও প্রশস্ত
করে তোলে। মাটির আঠালো ভাব বা 'কোহিশন' কমে যাওয়ার ফলে তা ধূলিকণার মতো আচরণ করে
এবং সামান্য বাতাসে উড়ে যায়। এই পানিশূন্যতা ও ভূমিক্ষয় মিলে উত্তরবঙ্গের
প্রাকৃতিক পরিবেশকে এক চরম সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। টেকসই সেচ
ব্যবস্থা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ না করলে এই মরুকরণ প্রক্রিয়া রোধ করা সম্ভব
হবে না।
৯. সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের অভাব
বাংলাদেশে নদীভাঙন নিয়ে প্রচুর আলোচনা ও কাজ হলেও বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয়
রোধে তেমন উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি দেখা যায় না। স্থানীয় কৃষি বিভাগগুলো কৃষকদের
এই বিষয়ে সচেতন করার ক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ
দেয় না। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কিছু কাজ করলেও তা প্রয়োজনের
তুলনায় অত্যন্ত সামান্য এবং সীমিত আকারে পরিচালিত হচ্ছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও
এই নির্দিষ্ট পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে খুব একটা দেখা যায় না
বর্তমানে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অভাব এবং এই বিষয়ের ওপর সঠিক ডাটা না থাকায়
কার্যকর কোনো জাতীয় পলিসি তৈরি হচ্ছে না। উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্পগুলো
কিছু ক্ষেত্রে সফল হলেও উত্তরাঞ্চলে এমন কোনো বিশাল বনায়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া
হয়নি। কৃষকদের বায়ু নিরোধক বেড়া তৈরি বা বিকল্প চাষাবাদ শেখানোর জন্য বিশেষ
প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও ভূমিক্ষয়
রোধে তেমন কোনো বিশেষ তহবিল রাখা হয় না যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ। সম্মিলিত
প্রচেষ্টার অভাবে এই নিরব ঘাতক বায়ুপ্রবাহ প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের উর্বর জমি
গ্রাস করে চলেছে অবলীলায়।
১০. ভবিষ্যৎ করণীয় ও টেকসই সমাধান
বায়ুপ্রবাহজনিত ভূমিক্ষয় রোধে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো পরিকল্পিত বনায়ন
এবং মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার বৈজ্ঞানিক কৌশল গ্রহণ করা। জমির আইলে প্রচুর
পরিমাণে নিম, বাবলা বা মেহগনি গাছ লাগিয়ে 'বায়ু প্রাচীর' তৈরি করলে বাতাসের গতি
কমানো সম্ভব হবে। কৃষকদের মালচিং পদ্ধতি বা মাটির ওপর খড়কুটা বিছিয়ে রাখার কৌশল
শেখাতে হবে যাতে বাতাসের সরাসরি স্পর্শ না লাগে। জৈব সারের ব্যবহার বাড়িয়ে
মাটির কণাগুলোর মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করতে হবে এবং যান্ত্রিক লাঙ্গলের গভীর চাষ কমাতে
হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা সহিষ্ণু ঘাস ও লতাগুল্ম রোপণ করে বালুর উড়ন্ত
প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে পরিকল্পিতভাবে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে
সামাজিক বনায়ন কর্মসূচীকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে জোর
দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে পারে এমন শস্য নির্বাচন করা এবং
সঠিক সময়ে বপন করাও একটি ভালো সমাধান। আধুনিক প্রযুক্তি এবং সনাতন পদ্ধতির
সমন্বয় ঘটিয়েই এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে আগামী দিনগুলোতে।
সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়োপযোগী সরকারি পদক্ষেপই পারে বাংলাদেশের উর্বর মাটিকে এই
বায়ুপ্রবাহের অভিশাপ থেকে রক্ষা করতে।
১১.উপসংহার:
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এই সমস্যা দিন দিন
বাড়ছে। মরুপ্রকরণ রোধ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বরেন্দ্র এলাকায়
ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ এবং বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।



এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url