এআই দিয়ে ভিডিও তৈরি: একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল গাইড
এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করা বর্তমান সময়ের
সবচেয়ে বৈপ্লবিক প্রযুক্তিগুলোর একটি। আগে একটি ভিডিও তৈরি করতে ক্যামেরা,
লাইটিং, স্টুডিও, এডিটর এবং অনেক সময়ের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এখন এআই-এর মাধ্যমে
আপনি শুধু কিছু টেক্সট লিখে বা নির্দেশ (Prompt) দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে পেশাদার
মানের ভিডিও তৈরি করতে পারেন।
নিচে এআই দিয়ে ভিডিও তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে একটি বিস্তারিত গাইড বা আর্টিকেল
দেওয়া হলো, যা আপনাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বুঝতে সাহায্য করবে।
পেজ সূচিপত্র:এআই দিয়ে ভিডিও তৈরি: একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল গাইড
১. এআই ভিডিও জেনারেশন কী?
এআই ভিডিও জেনারেশন হলো এমন একটি প্রযুক্তি যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)
ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও তৈরি করে। এটি ডেটা বিশ্লেষণ করে, প্যাটার্ন
শনাক্ত করে এবং সেই অনুযায়ী নতুন ভিডিও তৈরি করে। এই প্রযুক্তিটি বিভিন্ন
ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাচ্ছে, যেমন - বিনোদন, শিক্ষা, বিজ্ঞাপন এবং সংবাদ পরিবেশনা।
এআই ভিডিও জেনারেশন কিভাবে কাজ করে?
এআই ভিডিও জেনারেশনের মূল ভিত্তি হলো মেশিন লার্নিং (Machine Learning) এবং ডিপ
লার্নিং (Deep Learning) অ্যালগরিদম। এই অ্যালগরিদমগুলি প্রচুর পরিমাণে ভিডিও
ডেটা বিশ্লেষণ করে শেখে এবং তারপর সেই শেখার উপর ভিত্তি করে নতুন ভিডিও তৈরি করে।
এর কয়েকটি প্রধান ধাপ নিচে দেওয়া হলো:
১. ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ: প্রথমে, এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রচুর
পরিমাণে ভিডিও, ছবি, টেক্সট এবং অডিও ডেটা সংগ্রহ করা হয়। মডেল এই ডেটা বিশ্লেষণ
করে বিভিন্ন বস্তুর বৈশিষ্ট্য, গতিবিধি, রঙ এবং শব্দ প্যাটার্ন শেখে।
২. ফিচার এক্সট্র্যাকশন (Feature Extraction): সংগৃহীত ডেটা থেকে গুরুত্বপূর্ণ
বৈশিষ্ট্যগুলি (features) বের করা হয়। যেমন, একটি মানুষের মুখ, একটি গাড়ির গতি,
অথবা একটি পাখির উড়ান।
৩. মডেল প্রশিক্ষণ (Model Training): এরপর, এআই মডেলকে (যেমন, জেনারেটিভ
অ্যাডভারসারিয়াল নেটওয়ার্ক - GANs, বা ট্রান্সফরমার মডেল) এই বৈশিষ্ট্যগুলি
ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মডেলটি বারবার ডেটা প্রক্রিয়াকরণ করে এবং তার
ভুলগুলি সংশোধন করে আরও ভালো ভিডিও তৈরি করতে শেখে।
৪. ভিডিও তৈরি (Video Generation): প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর, মডেলটি নতুন ইনপুট
(যেমন, একটি টেক্সট বর্ণনা বা একটি স্থির চিত্র) গ্রহণ করে এবং তার উপর ভিত্তি
করে একটি সম্পূর্ণ নতুন ভিডিও তৈরি করে। এই ভিডিওতে শব্দ, গতি এবং দৃশ্যপট সবই
থাকতে পারে।
এআই ভিডিও জেনারেশনের প্রকারভেদ:
এআই ভিডিও জেনারেশন বিভিন্ন উপায়ে করা যেতে পারে:
টেক্সট-টু-ভিডিও (Text-to-Video): এখানে টেক্সট ইনপুট হিসেবে দেওয়া হয় এবং এআই
সেই বর্ণনা অনুযায়ী ভিডিও তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি লেখেন "একটি বিড়াল
সবুজ ঘাসে খেলছে", এআই সেই অনুযায়ী একটি ভিডিও তৈরি করবে।
ইমেজ-টু-ভিডিও (Image-to-Video): একটি স্থির চিত্র থেকে গতিশীল ভিডিও তৈরি করা
হয়। এআই ছবিটিকে অ্যানিমেট করে বা তাতে গতি যোগ করে।
অডিও-টু-ভিডিও (Audio-to-Video): অডিও ইনপুট থেকে ভিডিও তৈরি করা হয়। যেমন,
একটি বক্তৃতার অডিও থেকে বক্তার ঠোঁট নড়াচড়ার ভিডিও তৈরি করা।
থ্রিডি মডেল থেকে ভিডিও জেনারেশন: থ্রিডি মডেল ব্যবহার করে বাস্তবসম্মত বা
কাল্পনিক দৃশ্য তৈরি করা হয় এবং তারপর সেগুলোকে ভিডিওতে রূপান্তর করা হয়।
এআই ভিডিও জেনারেশনের সুবিধা:
সময় ও খরচ সাশ্রয়: ঐতিহ্যবাহী ভিডিও তৈরির প্রক্রিয়ায় অনেক সময় এবং খরচ
হয়। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত এবং কম খরচে ভিডিও তৈরি করা সম্ভব।
ব্যক্তিগতকরণ (Personalization): প্রতিটি দর্শকের জন্য আলাদাভাবে ব্যক্তিগতকৃত
ভিডিও তৈরি করা যায়, যা বিজ্ঞাপন এবং শিক্ষাক্ষেত্রে খুবই কার্যকর।
সৃজনশীলতা বৃদ্ধি: এআই নতুন এবং অভিনব ভিডিও ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করে, যা
মানুষের পক্ষে ভাবা কঠিন হতে পারে।
অ্যাক্সেসিবিলিটি: যাদের ভিডিও তৈরির দক্ষতা নেই, তারাও এআই ব্যবহার করে
উচ্চ-মানের ভিডিও তৈরি করতে পারেন।
এআই ভিডিও জেনারেশনের চ্যালেঞ্জ:
বাস্তবতা এবং গুণগত মান: যদিও এআই দ্রুত উন্নত হচ্ছে, তবে এখনও পুরোপুরি
বাস্তবসম্মত এবং উচ্চ-মানের ভিডিও তৈরি করা একটি চ্যালেঞ্জ।
নৈতিকতা এবং অপব্যবহার: ডিপফেক (Deepfake) প্রযুক্তির মতো অপব্যবহারের ঝুঁকি
রয়েছে, যা মিথ্যা তথ্য ছড়াতে ব্যবহার করা হতে পারে।
প্রশিক্ষণ ডেটার সীমাবদ্ধতা: এআই মডেলের গুণগত মান নির্ভর করে প্রশিক্ষণের জন্য
ব্যবহৃত ডেটার উপর। অপর্যাপ্ত বা পক্ষপাতদুষ্ট ডেটা নিম্নমানের ফলাফল দিতে পারে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা:
এআই ভিডিও জেনারেশন প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। আমরা এমন একটি বিশ্বের
দিকে এগোচ্ছি যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ভিডিও তৈরি করতে
পারবে। এটি চলচ্চিত্র শিল্প, বিপণন, শিক্ষা এবং সংবাদ পরিবেশনায় নতুন দিগন্ত
উন্মোচন করবে। ভবিষ্যতে, এআই আরও বাস্তবসম্মত, সৃজনশীল এবং ইন্টারেক্টিভ ভিডিও
তৈরি করতে সক্ষম হবে, যা আমাদের ডিজিটাল অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করবে।
এই প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে, এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য
অংশ হয়ে উঠবে এবং আমরা নতুন নতুন উপায়ে তথ্য বিনিময় এবং বিনোদন উপভোগ করতে
পারব।
২. ভিডিও তৈরির প্রধান ধাপসমূহ
এআই দিয়ে একটি মানসম্মত ভিডিও তৈরি করতে সাধারণত নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়:
ক) স্ক্রিপ্ট লিখন (Scriptwriting)
ভিডিওর মূল ভিত্তি হলো এর গল্প বা স্ক্রিপ্ট। আপনি চাইলে নিজেও লিখতে পারেন, অথবা
ChatGPT বা Google Gemini ব্যবহার করে একটি চমৎকার স্ক্রিপ্ট তৈরি করে নিতে
পারেন।
* সঠিক ব্যবহারের নিয়ম: এআই-কে বলুন আপনার ভিডিওর টপিক কী, ভিডিওটি কত বড়
হবে এবং এটি কাদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে।
খ) টেক্সট-টু-স্পিচ বা ভয়েসওভার (Voiceover)
ভিডিওর জন্য সুন্দর একটি কণ্ঠ প্রয়োজন। এখন আর আপনাকে মাইক্রোফোন নিয়ে বসতে হবে
না। ElevenLabs বা Murf AI-এর মতো টুল ব্যবহার করে আপনি মানুষের মতো স্বাভাবিক
কণ্ঠস্বর তৈরি করতে পারেন। এখানে আপনি চাইলে নিজের গলার স্বরের ক্লোনও (Voice
Cloning) করতে পারেন।
গ) ভিডিও ফুটেজ জেনারেশন (Visuals)
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখানে দুই ধরণের কাজ হতে পারে:
১. Avatar-based Video: যেখানে একজন এআই মানুষ কথা বলবে (যেমন: HeyGen বা
Synthesia)।
২. Cinematic/B-roll Video: যেখানে বাস্তবসম্মত দৃশ্য বা অ্যানিমেশন তৈরি হবে
(যেমন: Runway Gen-2 বা Pika Labs)।
ঘ) ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও এডিটিং
ভিডিওর আমেজ তৈরি করতে কপিরাইট মুক্ত মিউজিক প্রয়োজন। Suno AI বা Soundraw
ব্যবহার করে আপনি নিজেই মিউজিক তৈরি করতে পারেন। শেষে সবগুলোকে একত্রে জোড়া
দেওয়ার জন্য CapCut বা Adobe Premiere Pro-এর এআই ফিচার ব্যবহার করতে পারেন।
৩. জনপ্রিয় এআই ভিডিও টুলস এবং তাদের কাজ
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ভিডিও কন্টেন্ট তৈরির জগৎ পুরোপুরি বদলে গেছে। আগে একটি
হাই-কোয়ালিটি ভিডিও বানাতে যেখানে দক্ষ এডিটর, দামি ক্যামেরা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা
সময়ের প্রয়োজন হতো, এখন এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তা করা যাচ্ছে
কয়েক মিনিটে।
জনপ্রিয় এআই ভিডিও টুলস এবং তাদের কাজ
ভিডিও তৈরির ধরণ অনুযায়ী এই টুলগুলোকে মূলত তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়:
১. টেক্সট-টু-ভিডিও জেনারেটর (Text-to-Video)
এই টুলগুলো আপনার দেওয়া বর্ণনা (Prompt) থেকে সরাসরি ভিডিও তৈরি করে দেয়।
OpenAI Sora 2: এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিডিও জেনারেটর। এটি
অবিশ্বাস্য রকমের বাস্তবসম্মত (Realistic) ভিডিও তৈরি করতে পারে। জটিল ফিজিক্স বা
মোশন বুঝতে পারার কারণে এর ভিডিওগুলো আসল ফুটেজের মতোই মনে হয়।
Google Veo (ভিও): গুগলের এই টুলটি হাই-ডেফিনিশন (4K) ভিডিও তৈরির জন্য জনপ্রিয়।
এর বিশেষত্ব হলো এটি ভিডিওর সাথে মানানসই মিউজিক এবং সাউন্ড ইফেক্টও তৈরি করতে
পারে।
Runway Gen-3 Alpha: সিনেমাটিক ভিডিও এবং সৃজনশীল ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের জন্য এটি
প্রফেশনালদের প্রথম পছন্দ। এতে 'মোশন ব্রাশ' এর মতো ফিচার আছে যা দিয়ে ভিডিওর
নির্দিষ্ট অংশকে মুভমেন্ট দেওয়া যায়।
Kling AI: বর্তমানে এটি দীর্ঘ ভিডিও (৫-১০ সেকেন্ডের বেশি) এবং উন্নত মোশন
কন্ট্রোলের জন্য ব্যাপক জনপ্রিয়।
২. এআই অ্যাভাটার ও প্রেজেন্টেশন টুলস
ক্যামেরার সামনে না দাঁড়িয়েও মানুষের মতো দেখতে 'অ্যাভাটার' দিয়ে ভিডিও তৈরির
জন্য এগুলো সেরা।
Synthesia: এটি বিজনেস এবং ট্রেনিং ভিডিওর জন্য বিখ্যাত। এখানে আপনি টেক্সট লিখে
দিলে একটি এআই অ্যাভাটার সেটি মানুষের মতো হাত-মুখ নেড়ে বলে দেবে।
HeyGen: হাই-কোয়ালিটি ভিডিও মেসেজ এবং মার্কেটিং কন্টেন্টের জন্য এটি জনপ্রিয়।
এর 'ভয়েস ক্লোনিং' ফিচার ব্যবহার করে নিজের কণ্ঠেই ভিডিও তৈরি করা সম্ভব।
৩. অটোমেটেড এডিটিং ও সোশ্যাল মিডিয়া টুলস
বড় ভিডিও থেকে ছোট ক্লিপ বা ব্লগ পোস্ট থেকে ভিডিও তৈরির জন্য এই টুলগুলো কাজ
করে।
Pictory: আপনি যদি কোনো আর্টিকেলের লিঙ্ক বা স্ক্রিপ্ট দেন, তবে এই টুলটি
অটোমেটিকভাবে প্রাসঙ্গিক স্টক ফুটেজ খুঁজে একটি চমৎকার ভিডিও বানিয়ে দেয়।
InVideo AI: এটি মূলত ইউটিউবার এবং সোশ্যাল মিডিয়া ক্রিয়েটরদের জন্য। স্ক্রিপ্ট
রাইটিং থেকে শুরু করে ভয়েসওভার এবং সাবটাইটেল—সবই এক ক্লিকে করে দেয়।
Descript: এটি একটি 'ম্যাজিক' এডিটর। এখানে আপনি ভিডিওর ট্রান্সক্রিপ্ট (লেখা)
এডিট করলেই ভিডিওর ভেতর থেকেও সেই অংশটি এডিট বা ডিলিট হয়ে যায়।
এক নজরে টুলস ও তাদের বিশেষত্ব
টুলসের নাম প্রধান কাজ কাদের জন্য উপযোগী
Sora / Veo টেক্সট থেকে হাই-কোয়ালিটি ভিডিও সিনেমাটিক ও রিয়েলিস্টিক ভিডিও
নির্মাতা
Synthesia এআই অ্যাভাটার ভিডিও কর্পোরেট ট্রেইনার ও শিক্ষক
Pictory ব্লগ/টেক্সট থেকে ভিডিও কন্টেন্ট মার্কেটার ও ব্লগার
Runway প্রফেশনাল ভিডিও এডিটিং সৃজনশীল এডিটর ও ডিজাইনার
HeyGen ভয়েস ক্লোনিং ও মেসেজিং সেলস ও পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং
এআই ভিডিও টুলস ব্যবহারের সুবিধা
১. সময় সাশ্রয়: কয়েক দিনের কাজ কয়েক মিনিটে শেষ করা যায়।
২. খরচ কম: স্টুডিও সেটআপ বা বড় টিমের প্রয়োজন হয় না।
৩. দক্ষতার অভাব মেটায়: প্রফেশনাল এডিটিং না জানলেও সুন্দর ভিডিও বানানো সম্ভব।
৪. ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য ভিডিও তৈরির পদ্ধতি (Step-by-Step)
১. আইডিয়া জেনারেশন: প্রথমে ঠিক করুন আপনি কোন বিষয়ে ভিডিও বানাবেন।
২. স্ক্রিপ্ট ও প্রম্পট: ChatGPT-কে দিয়ে স্ক্রিপ্ট লেখান এবং ভিডিওর প্রতিটি
সিনের জন্য 'Image Prompt' তৈরি করে নিন।
৩. ভিডিও তৈরি: Runway বা Pika Labs-এ গিয়ে আপনার প্রম্পটগুলো লিখুন। যেমন: "A
futuristic city in Bangladesh with flying cars, cinematic lighting, 4k."
৪. ভয়েসওভার যোগ করা: আপনার স্ক্রিপ্টটি ElevenLabs-এ পেস্ট করে একটি গভীর ও
সুন্দর কণ্ঠ ডাউনলোড করুন।
৫. এডিটিং: ইনভিডিও (InVideo) বা ক্যাপকাট (CapCut)-এ গিয়ে ভিডিও ফুটেজ এবং
ভয়েসওভার একসাথে সিঙ্ক করুন। প্রয়োজনে এআই সাবটাইটেল জেনারেটর ব্যবহার করে
ক্যাপশন যোগ করুন।
৫. এআই ভিডিও তৈরির সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
সুবিধা:
* খরচ সাশ্রয়: ক্যামেরা, অভিনেতা বা দামি স্টুডিওর প্রয়োজন নেই।
* দ্রুত কাজ: যে ভিডিও তৈরি করতে এক সপ্তাহ লাগত, তা এখন ১ ঘণ্টায় সম্ভব।
* সৃজনশীলতা: আপনার কল্পনা যা করতে পারে, এআই তা পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পারে।
সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ:
* মোশন বা নড়াচড়া: অনেক সময় এআই ভিডিওতে মানুষের হাত বা পায়ের নড়াচড়া
অস্বাভাবিক দেখায়।
* আবেগ (Emotion): মানুষের মতো নিখুঁত আবেগ ফুটিয়ে তোলা এখনো চ্যালেঞ্জিং।
* কপিরাইট ও নীতিশাস্ত্র: এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওর মালিকানা নিয়ে আইনি বিতর্ক
থাকতে পারে।
৬. ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে নৈতিকতা ও সতর্কতা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে এখন কয়েক মুহূর্তেই বাস্তবসম্মত ভিডিও
তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু এই ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই দায়িত্বশীল
হতে হবে। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে নৈতিকতা এবং সচেতনতা বজায় রাখা এখন সময়ের
দাবি।
১. নৈতিক বিবেচ্য বিষয়সমূহ
এআই ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো মাথায় রাখা জরুরি:
সম্মতি (Consent): কারো অনুমতি ছাড়া তার চেহারা বা কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে ভিডিও
তৈরি করা অনৈতিক। বিশেষ করে মৃত ব্যক্তি বা পাবলিক ফিগারদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত
সংবেদনশীল বিষয়।
স্বচ্ছতা (Transparency): ভিডিওটি যদি এআই দ্বারা তৈরি হয়, তবে তা স্পষ্টভাবে
উল্লেখ করা উচিত। দর্শককে বিভ্রান্ত করা বা কৃত্রিম ভিডিওকে আসল বলে চালিয়ে দেওয়া
নৈতিকতাবিরোধী।
সত্যতা বজায় রাখা (Truthfulness): এআই ব্যবহার করে ভুল তথ্য বা প্রোপাগান্ডা
ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়ে মিথ্যা ভিডিও তৈরি করা সমাজের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
২. প্রধান ঝুঁকি ও সতর্কতা
এআই ভিডিও প্রযুক্তির কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে যা নিয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে:
ডিপফেক (Deepfake): বর্তমানে ডিপফেক ভিডিওর মাধ্যমে মানুষের মানহানি বা ভুয়া
নিউজ ছড়ানো হচ্ছে। কোনো ভিডিও দেখে সরাসরি বিশ্বাস করার আগে সেটির উৎস যাচাই করা
উচিত।
কপিরাইট লঙ্ঘন: এআই মডেলগুলো প্রায়ই ইন্টারনেটে থাকা হাজার হাজার শিল্পীর কাজ
থেকে শেখে। অন্যের কাজের ওপর ভিত্তি করে ভিডিও তৈরির সময় মেধাস্বত্ব বা কপিরাইট
আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রয়োজন।
সাইবার অপরাধ: স্ক্যাম বা জালিয়াতির কাজে এআই ভিডিও ব্যবহার বাড়ছে। অপরিচিত
ভিডিও কলে কারো কথা শুনেই আর্থিক লেনদেন বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার আগে
সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
৩. দায়িত্বশীল ব্যবহারের উপায়
প্রযুক্তির সুফল পেতে আমাদের নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত:
ওয়াটারমার্ক ব্যবহার করা: ভিডিওর এক কোণে 'AI Generated' লিখে দেওয়া বা
নির্দিষ্ট চিহ্ন ব্যবহার করা।
সঠিক টুল নির্বাচন: কেবল স্বীকৃত এবং নৈতিক নীতিমালা মেনে চলে এমন এআই টুল বা
প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা।
যাচাইকরণ (Fact-checking): সন্দেহজনক ভিডিওর ক্ষেত্রে মেটাডেটা পরীক্ষা করা বা
রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা।
সারকথা: প্রযুক্তি নিজে থেকে ভালো বা মন্দ হয় না; এর ব্যবহারকারী কীভাবে এটি
ব্যবহার করছেন সেটাই আসল। এআই ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে সৃজনশীলতাকে সম্মান জানানোর
পাশাপাশি সত্যতা এবং অন্যের গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা আমাদের প্রত্যেকের
দায়িত্ব।
৭. উপসংহার
এআই দিয়ে ভিডিও তৈরি করা এখন আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা।
আপনি যদি একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, মার্কেটার বা উদ্যোক্তা হন, তবে এখনই এই
প্রযুক্তি শেখার সঠিক সময়। যত বেশি প্রম্পট লেখা প্র্যাকটিস করবেন, আপনার ভিডিওর
মান তত উন্নত হবে।

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url