পাহাড়ের ঢালের আড়াআড়ি চাষ পদ্ধতিকে কি বলে

পাহাড়ের ঢালে মাটির ক্ষয় রোধ এবং চাষাবাদের বিশেষ পদ্ধতিকে সাধারণত ধাপ চাষ বা সিঁড়ি চাষ (Terrace Farming) বলা হয়। তবে আড়াআড়িভাবে চাষ করার নির্দিষ্ট কৌশলটিকে অনেক সময় কন্টুর চাষ (Contour Farming)-ও বলা হয়ে থাকে।
পাহাড়ের ঢালের

আজকের আর্টিকেলটি পরে আপনারা জানতে পারবেন পাহাড়ের ঢালের আড়াআড়ি চাষ পদ্ধতিকে কি বলে

পেজ সূচিপত্র:পাহাড়ের ঢালের আড়াআড়ি চাষ পদ্ধতিকে কি বলে

  • ধাপ চাষ ও কন্টুর চাষের সাধারণ ধারণা
  • ভূমি ক্ষয় রোধে ধাপ চাষের ভূমিকা
  • জলসেচ ও জল ব্যবস্থাপনা কৌশল
  • শস্য বৈচিত্র্য ও ফলন বৃদ্ধি
  • পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা
  • ধাপ চাষের ঐতিহাসিক পটভূমি
  • অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও জীবিকা
  • চাষাবাদের কারিগরি ও জ্যামিতিক দিক
  • জুম চাষ বনাম ধাপ চাষের পার্থক্য
  • চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
  • উপসংহার: প্রকৃতির সাথে মেলবন্ধন

​১. ধাপ চাষ ও কন্টুর চাষের সাধারণ ধারণা

​পাহাড়ের ঢালু জমিতে চাষাবাদ করার অন্যতম প্রধান এবং জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো ধাপ চাষ বা কন্টুর চাষ পদ্ধতি। পাহাড়ে সমতল ভূমির অভাব থাকায় মানুষ আদিমকাল থেকেই ঢালু জমিকে কৃত্রিমভাবে সমতল করে কৃষিকাজ করে আসছে। এই পদ্ধতিতে পাহাড়ের ঢালকে আড়াআড়িভাবে কেটে সিঁড়ির মতো ছোট ছোট ধাপ তৈরি করা হয় যা দেখতে চমৎকার। পাহাড়ের গা বেয়ে এই ধাপগুলো ধাপে ধাপে নেমে যায় বলে একে ইংরেজিতে 'টেরাস ফার্মিং' বলা হয়ে থাকে। মূলত মাটির উর্বরতা রক্ষা এবং জলের সঠিক ব্যবহারের কথা মাথায় রেখেই এই চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এটি পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না করে মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়ার একটি অনন্য কৌশল হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে কৃষকেরা জীবনধারণের জন্য এই বিশেষ কৃষিপদ্ধতির ওপর পুরোপুরিভাবে নির্ভরশীল হয়ে থাকেন। আধুনিক কৃষি বিজ্ঞানে এই পদ্ধতিকে পাহাড়ের জন্য সবথেকে টেকসই এবং কার্যকর কৃষি ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা হয়। যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে এই পদ্ধতিতে চাষ করলে পাহাড়ের প্রতিকূল পরিবেশেও বাম্পার ফলন পাওয়া সম্ভব হয় সবসময়।

​২. ভূমি ক্ষয় রোধে ধাপ চাষের ভূমিকা

​পাহাড়ের ঢালে আড়াআড়ি চাষ করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো বৃষ্টির জলের প্রবল গতি কমিয়ে ভূমি ক্ষয় রোধ করা। যদি ঢালু জমিতে লম্বালম্বিভাবে চাষ করা হতো তবে বৃষ্টির জল খুব সহজেই ওপরের মাটি ধুয়ে নিয়ে যেত। আড়াআড়িভাবে ধাপ তৈরির ফলে জল পাহাড়ের নিচে নামার সময় প্রতি ধাপে বাধা পায় এবং গতি হারায়। এর ফলে মাটির উপরের স্তরের পুষ্টিগুণ ধুয়ে চলে যেতে পারে না এবং জমির উর্বরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। মৃত্তিকা সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের মতে এটি পাহাড়ের মাটি রক্ষার জন্য সবথেকে কার্যকর একটি প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। এই পদ্ধতিতে মাটির কণাগুলো একে অপরের সাথে সংবদ্ধ থাকে এবং ধস নামার সম্ভাবনা অনেকাংশে হ্রাস পায়। চাষের এই বিন্যাসটি মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে যা শুষ্ক মৌসুমে গাছের বৃদ্ধিতে অত্যন্ত সহায়ক হয়। পাহাড়ের ঢালকে নিরাপদ রাখতে এবং চাষের জমিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এই পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে এই বৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতি কৃষকদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হয়ে আজ দেখা দিয়েছে।

​৩. জলসেচ ও জল ব্যবস্থাপনা কৌশল

​পাহাড়ি এলাকায় জলের অভাব মেটাতে এবং সঠিক জলসেচ নিশ্চিত করতে আড়াআড়ি ধাপ চাষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বৃষ্টির জল যখন পাহাড়ের উপর থেকে নিচে নেমে আসে তখন প্রতিটি ধাপ সেই জলকে শোষণ করার সুযোগ পায়। এই পদ্ধতিতে জল সরাসরি নিচে গড়িয়ে না গিয়ে প্রতিটি ধাপে জমে থাকে যা মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে। পাহাড়ের ঝর্ণা বা ছড়া থেকে আসা জলকে নালা দিয়ে এক ধাপ থেকে অন্য ধাপে প্রবাহিত করা হয়। এর ফলে জলের অপচয় রোধ হয় এবং প্রতিটি গাছ সমানভাবে প্রয়োজনীয় পরিমাণ জল গ্রহণ করার সুযোগ পায়। অতিরিক্ত জল বের করে দেওয়ার জন্য ধাপগুলোতে বিশেষ নিকাশি ব্যবস্থার পরিকল্পনা রাখা হয় যেন জল জমে না থাকে। জলের এই সুশৃঙ্খল ব্যবহারের ফলে পাহাড়ের কঠিন ঢালেও ধান বা সবজির মতো অধিক জল লাগে এমন ফসল ফলে। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় পাহাড়ে ড্রিপ ইরিগেশন বা বিন্দু সেচ পদ্ধতিও এখন এই ধাপগুলোর ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে। জল ব্যবস্থাপনার এই চমত্কার কৌশলটি পাহাড়ের কৃষিকে অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং লাভজনক পেশা হিসেবে গড়ে তুলেছে।

​৪. শস্য বৈচিত্র্য ও ফলন বৃদ্ধি

​ধাপ চাষ বা আড়াআড়ি চাষ পদ্ধতিতে পাহাড়ের বিভিন্ন উচ্চতায় বিভিন্ন ধরনের শস্য উৎপাদন করা খুব সহজ হয়। সাধারণত নিচের ধাপগুলোতে যেখানে জল বেশি জমে সেখানে ধান বা পাটের মতো ফসলের চাষ বেশি করা হয়। মাঝখানের ধাপগুলোতে বিভিন্ন প্রকারের মৌসুমি সবজি যেমন টমেটো, সিম, আলু বা কপির চাষ করা হয়ে থাকে। একেবারে ওপরের ধাপগুলোতে চা, কফি বা ফলদ বৃক্ষ রোপণ করা হয় যা মাটির গভীর থেকে রস সংগ্রহ করে। এই পদ্ধতিতে জমিকে খণ্ড খণ্ড করে ভাগ করায় একই জমিতে বহুমুখী ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হয় সবার জন্য। শস্যের এই বৈচিত্র্য কৃষকের আয়ের উৎসকে বৃদ্ধি করে এবং খাদ্যের চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। আড়াআড়ি চাষের ফলে মাটির পুষ্টিগুণ সব জায়গায় সমানভাবে বজায় থাকে যা ফলন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে অনেক বেশি। সঠিক সার এবং উন্নত বীজ ব্যবহার করলে সমতল ভূমির তুলনায় পাহাড়েও প্রায় সমান পরিমাণ ফলন পাওয়া সম্ভব। কৃষকেরা এই পদ্ধতিতে চাষ করে বছরের বারো মাসই কোনো না কোনো ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হন অনায়াসেই।

​৫. পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা

​পাহাড়ের ঢালে আড়াআড়ি চাষ পদ্ধতি শুধুমাত্র ফসল উৎপাদনের মাধ্যম নয় বরং এটি পরিবেশ রক্ষার একটি কৌশল। বন উজাড় করে জুম চাষ করার চেয়ে ধাপ চাষ পদ্ধতি অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘস্থায়ী কৃষি সমাধান। এই পদ্ধতিতে পাহাড়ের মূল কাঠামো ঠিক রাখা হয় এবং গাছপালাকে ঢাল সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হয়। এটি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়তা করে কারণ ধাপগুলোর চারপাশে অনেক সময় বুনো গাছপালা বা ঘাস লাগানো হয়ে থাকে। মাটির নিচের স্তরের জলস্তর বৃদ্ধি করতে এই পদ্ধতি সাহায্য করে কারণ জল চুইয়ে ভূগর্ভে প্রবেশ করার সময় পায়। কার্বন নিঃসরণ কমাতেও এই সবুজ ধাপগুলো অবদান রাখে এবং পাহাড়ের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এই চাষাবাদের ফলে পাহাড়ি এলাকায় বন্যপ্রাণীদের বিচরণ ক্ষেত্র পুরোপুরি নষ্ট হয় না বরং অনেক সময় সংরক্ষিত থাকে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন আকস্মিক বন্যা বা ভূমিধসের ঝুঁকি কমাতে এই ধরনের সুপরিকল্পিত কৃষি জমি ঢাল হিসেবে কাজ করে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পাহাড়ি অঞ্চলের এই পরিবেশবান্ধব চাষ পদ্ধতিকে বিশ্বজুড়ে আজ উৎসাহিত করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

​৬. ধাপ চাষের ঐতিহাসিক পটভূমি

পাহাড়ের ঢালের

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে প্রাচীন সভ্যতাগুলোতেও পাহাড়ের ঢালে আড়াআড়ি চাষ করার প্রমাণ পাওয়া গেছে অনেক জায়গায়। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা সভ্যতার মানুষেরা এই ধাপ চাষ পদ্ধতিতে অত্যন্ত পারদর্শী ছিল বলে জানা যায়। এশিয়ায় চীন, জাপান, ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের পাহাড়ি এলাকায় হাজার বছর ধরে এই পদ্ধতিতে ধান চাষ হয়ে আসছে। ভারতের হিমালয় অঞ্চল এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা এই পদ্ধতির আধুনিকায়ন ঘটিয়ে চাষাবাদ করে যাচ্ছে। প্রাচীনকালের মানুষ যখন সমতল ভূমিতে জায়গার অভাব বোধ করত তখন তারা পাহাড়কে আবাদযোগ্য করার কথা ভাবত। সেই ভাবনা থেকেই পাহাড়ের কঠিন শিলা বা মাটি কেটে কেটে ধাপে ধাপে সমতল ভূমি তৈরির সূচনা হয়েছিল। এই পদ্ধতিটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কৃষকদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আরও বেশি সমৃদ্ধ এবং বিজ্ঞানসম্মত হয়ে উঠেছে আজ। কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই কেবল কায়িক শ্রমে গড়ে তোলা এই ধাপগুলো মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক বিরাট নিদর্শন। আজ এটি পর্যটনেরও একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ এই ধাপগুলোর সৌন্দর্য যে কাউকে সহজেই মুগ্ধ করে ফেলে।

​৭. অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও জীবিকা

​পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জীবিকা নির্বাহের প্রধান চালিকাশক্তি হলো এই ধাপ চাষ বা কন্টুর চাষ। যেখানে অন্য কোনো শিল্প গড়ে তোলা কঠিন সেখানে কৃষিকাজই মানুষের আয়ের প্রধান এবং একমাত্র উৎস হয়ে দাঁড়ায়। আড়াআড়ি চাষের ফলে ফলন ভালো হয় বিধায় কৃষকেরা স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বাইরেও ফসল রপ্তানি করতে পারে। চা এবং কফির মতো অর্থকরী ফসলগুলো এই ধাপ চাষ পদ্ধতিতে সবথেকে ভালো হয় যা বৈদেশিক মুদ্রা আনে। এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হয় যা পাহাড়ি এলাকায় কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি করে দেয়। পরিবারগুলো নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজেরাই উৎপাদন করতে পারে যা তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক কমিয়ে দিতে সাহায্য করে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এখন এই কৃষকদের ঋণ এবং উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে সহযোগিতা করছে জীবনমান উন্নয়নের জন্য। পর্যটনের প্রসারের ফলে অনেক সময় এই সুন্দর খামারগুলো দেখতে আসা পর্যটকদের থেকেও স্থানীয়রা আয় করতে পারছে। তাই পাহাড়ের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই বিশেষ চাষ পদ্ধতিটি আজ এক অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে সবার কাছে।

​৮. চাষাবাদের কারিগরি ও জ্যামিতিক দিক

​ধাপ চাষ বা আড়াআড়ি চাষ করার সময় জমির ঢাল এবং জ্যামিতিক পরিমাপের দিকে বিশেষ নজর দিতে হয়। ঢাল যদি খুব বেশি খাড়া হয় তবে ধাপগুলো ছোট ছোট এবং খুব ঘন করে তৈরি করতে হয় সবসময়। সাধারণত প্রতি ধাপে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ উচ্চতা বজায় রাখা হয় যেন জল ওপর থেকে নিচে পড়ার সময় ধাক্কা না পায়। কন্টুর চাষের ক্ষেত্রে পাহাড়ের একই উচ্চতার বিন্দুগুলোকে যোগ করে কাল্পনিক রেখা বরাবর চাষের নালা তৈরি করা হয়। এই কারিগরি দিকটি অনুসরণ করলে জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং জমির প্রতিটি অংশ সমানভাবে উর্বরতা লাভ করে। অনেক সময় পাথর ব্যবহার করে ধাপের কিনারাগুলোকে শক্ত করা হয় যেন প্রবল বৃষ্টিতে মাটি ধসে না পড়ে সহজে। ড্রেন বা নিকাশি নালাগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে তা ঢালের সাথে লম্বালম্বি না হয়ে আড়াআড়ি থাকে। অভিজ্ঞ কৃষকেরা কোনো আধুনিক ফিতা ছাড়াই তাদের চোখের মাপে এই জ্যামিতিক ধাপগুলো তৈরি করতে অত্যন্ত দক্ষ। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি হলো ঢাল ব্যবস্থাপনার এক অনন্য প্রকৌশল যা পাহাড়ের মাটিকে স্থায়িত্ব প্রদান করে দীর্ঘকাল ধরে।

​৯. জুম চাষ বনাম ধাপ চাষের পার্থক্য

পাহাড়ের ঢালের

পাহাড়ে প্রচলিত জুম চাষ এবং বৈজ্ঞানিক ধাপ চাষ বা আড়াআড়ি চাষের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য লক্ষ করা যায়। জুম চাষে পাহাড়ের বন পুড়িয়ে চাষ করা হয় যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং মাটির উর্বরতা দ্রুত কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে ধাপ চাষ একটি স্থায়ী চাষ পদ্ধতি যেখানে বছরের পর বছর একই জমিতে ফসল ফলানো সম্ভব হয় প্রতিনিয়ত। জুম চাষের ফলে পাহাড় ন্যাড়া হয়ে যায় এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায় যা মানুষের জন্য হুমকি স্বরূপ। কিন্তু আড়াআড়ি চাষ পদ্ধতি পাহাড়কে সুরক্ষিত রাখে এবং মাটির বাঁধনকে আরও বেশি শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। জুম চাষে সাধারণত একবার ফসল কাটার পর জমি ফেলে রাখা হয় কিন্তু ধাপ চাষে নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়। দীর্ঘমেয়াদী ফলনের ক্ষেত্রে ধাপ চাষ অনেক বেশি লাভজনক কারণ এখানে সার এবং জলের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত থাকে। পরিবেশবাদীরা তাই জুম চাষ বন্ধ করে কৃষকদের আধুনিক ধাপ চাষে উদ্বুদ্ধ করার জন্য নিয়মিত প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। পাহাড়ের টেকসই কৃষি ভবিষ্যতের জন্য এই উত্তরণ বা পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

​১০. চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

​ধাপ চাষ পদ্ধতিতে চাষ করা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ কারণ এখানে আধুনিক ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব। প্রতিটি ধাপ হাতে তৈরি করতে হয় এবং ফসলের পরিচর্যার জন্য মানুষের শ্রমের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়। পাহাড়ের দুর্গমতার কারণে উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়া এবং সার পরিবহন করা অনেক সময় ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে কৃষকের জন্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টি এই চাষ পদ্ধতিতে অনেক সময় বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে বর্তমান সময়ে। তবে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ছোট ছোট কৃষি যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে ভবিষ্যতে। কৃষি বিজ্ঞানীরা এখন এমন সব বীজের জাত উদ্ভাবন করছেন যা পাহাড়ের কম জলে অধিক ফলন দিতে সক্ষম হবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সঠিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা থাকলে এই চাষ পদ্ধতি আরও অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে দ্রুত। পাহাড়ি জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পরিবেশ রক্ষা করতে ধাপ চাষই হবে আগামীর শ্রেষ্ঠ কৃষি মডেল। আমাদের উচিত এই প্রাচীন অথচ বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিকে আরও আধুনিক করে পাহাড়ের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করা।

১১.উপসংহার: প্রকৃতির সাথে মেলবন্ধন

​ধাপ চাষ বা টেরাস ফার্মিং কেবল একটি কৃষি পদ্ধতি নয়, বরং এটি মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এক অপূর্ব নিদর্শন। যেখানে খাড়া পাহাড় মানুষের খাদ্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে মানুষ নিজের মেধা আর শ্রমে সেই পাহাড়কেই শস্যশ্যামল করে তুলেছে। এই পদ্ধতি একদিকে যেমন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে মাটির ক্ষয় রুখে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখে। সুশৃঙ্খল ধাপগুলো যখন সবুজ ফসলে ভরে ওঠে, তখন তা কেবল কৃষকের গোলা ভরে না, বরং পৃথিবীকে উপহার দেয় এক নয়নকাড়া ল্যান্ডস্কেপ। পরিশেষে বলা যায়, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষির পথে ধাপ চাষ এক অনন্য মাইলফলক।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url