1000 ইটের গাঁথুনির সিমেন্টের হিসাব
যেকোনো নির্মাণ কাজের মূল ভিত্তি হলো সঠিক পরিমাপ। ইটের গাঁথুনি বা ব্রিক
ওয়ার্কের ক্ষেত্রে মশলার (সিমেন্ট ও বালু) অনুপাত ঠিক না থাকলে দেয়ালের স্থায়িত্ব
নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। সাধারণত ৫ ইঞ্চি বা ১০ ইঞ্চি গাঁথুনির ওপর ভিত্তি করে
উপাদানের পরিমাণে কিছুটা তারতম্য হতে পারে।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ১০০০ ইটের গাঁথুনির জন্য প্রয়োজনীয় সিমেন্ট ও বালুর
হিসাব বের করার পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা করব।
পেজ সূচিপত্র:1000 ইটের গাঁথুনির সিমেন্টের হিসাব
১. গাঁথুনির কাজের প্রাথমিক ধারণা
ইটের গাঁথুনি করার আগে আমাদের জানতে হবে কোন অনুপাতে মশলা তৈরি করা হচ্ছে এবং
ইটের আকার কেমন। সাধারণত আমাদের দেশে ৯.৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য, ৪.৫ ইঞ্চি প্রস্থ এবং
২.৭৫ ইঞ্চি উচ্চতার ইট ব্যবহার করা হয়। ১০০০টি ইটের জন্য প্রয়োজনীয় মশলার পরিমাণ
বের করতে হলে প্রথমে প্রতি ঘনফুটে কতটি ইট লাগে তা জানতে হয়। সাধারণত ৫ ইঞ্চি
পুরু দেয়ালের গাঁথুনিতে প্রতি বর্গফুটে ৫টি ইট প্রয়োজন হয় বলে ধরা হয়। কিন্তু ১০
ইঞ্চি দেয়ালের ক্ষেত্রে হিসাবটি সম্পূর্ণ আলাদা এবং সেখানে মশলার পরিমাণও
তুলনামূলক বেশি লাগে। ইটের ফাঁকগুলোতে মশলা কতটুকু ঢুকছে তার ওপর ভিত্তি করেই
সিমেন্টের সঠিক পরিমাণটি নির্ভর করে থাকে। কাজের গুণমান নিশ্চিত করতে সঠিক মাপের
ইট এবং উন্নত মানের বালু ব্যবহার করা একান্ত প্রয়োজন।
২. মশলার অনুপাত নির্ধারণ
গাঁথুনির কাজে সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ বা অনুপাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
যা মজবুত নির্মাণ নিশ্চিত করে। সাধারণত ইটের গাঁথুনির জন্য ১:৪ অথবা ১:৬ অনুপাতে
সিমেন্ট এবং বালুর মিশ্রণ তৈরি করা হয়ে থাকে। ১:৪ অনুপাতের অর্থ হলো এক বস্তা
সিমেন্টের সাথে চার বস্তা বালু ভালোভাবে মিশিয়ে মশলা তৈরি করা। অন্যদিকে ১:৬
অনুপাত ব্যবহার করা হয় যেখানে দেয়ালের ওপর লোড কম থাকে বা খরচ কিছুটা কমাতে হয়।
ভালো ফিনিশিং এবং দীর্ঘস্থায়ী গাঁথুনির জন্য অভিজ্ঞ রাজমিস্ত্রিরা সাধারণত ১:৪
অনুপাত ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
অনুপাত ঠিক না থাকলে গাঁথুনি দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে দেয়ালে ফাটল ধরার
সম্ভাবনা থাকে। তাই বালু ও সিমেন্ট মেশানোর সময় পরিমাপের জন্য নির্দিষ্ট বালতি বা
বক্স ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
৩. মশলার আয়তন বা ভলিউম বের করা
১০০০টি ইটের গাঁথুনিতে মোট কতটুকু মশলা লাগবে তা বের করতে হলে প্রথমে গাঁথুনির
মোট আয়তন জানতে হয়। সাধারণত ১০০০টি ইট দিয়ে যদি ৫ ইঞ্চি দেয়াল গাঁথা হয় তবে প্রায়
৪৫ থেকে ৫০ ঘনফুট মশলা লাগে। শুকনো অবস্থায় বালু ও সিমেন্টের মিশ্রণ যে আয়তন দখল
করে, পানি মেশানোর পর তা কমে যায়। এই কারণে হিসাব করার সময় শুকনো মশলার আয়তন বা
ড্রাই ভলিউম ১.৫ গুণ বেশি ধরে হিসাব করতে হয়। মশলার আয়তন সঠিকভাবে বের করতে না
পারলে সিমেন্টের হিসেবে বড় ধরনের গরমিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ইটের গাঁথুনির
ফাঁকা জায়গা বা 'জয়েন্ট' গুলো সাধারণত আধা ইঞ্চি পুরু রাখা হয় এই হিসাবের
সুবিধার্থে। সঠিক হিসাব জানলে মালামাল অপচয় রোধ করা সম্ভব হয় এবং কাজের গতিও
অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়।
৪. শুকনো মশলার হিসাব পদ্ধতি
ভেজা মশলার আয়তনকে শুকনো মশলায় রূপান্তর করার প্রক্রিয়াটি নির্মাণ প্রকৌশলের
একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু জরুরি ধাপ। ধরা যাক ১০০০ ইটের জন্য আমাদের ৩৫ ঘনফুট
ভেজা মশলা প্রয়োজন যা গাঁথুনির পর পাওয়া যাবে। এই ৩৫ ঘনফুটকে ১.৫ দিয়ে গুণ করলে
আমরা পাই ৫২.৫ ঘনফুট শুকনো মশলার আয়তন বা ড্রাই ভলিউম। এই শুকনো আয়তন থেকেই
আমাদের বের করতে হবে এর মধ্যে কতটুকু সিমেন্ট এবং কতটুকু বালু বিদ্যমান। বালুর
আর্দ্রতা এবং সিমেন্টের সূক্ষ্মতার ওপর ভিত্তি করে এই হিসাবে সামান্য তারতম্য হতে
পারে বাস্তব ক্ষেত্রে। তবে ১.৫ গুণ ধরে হিসাব করলে সাধারণত মালামাল কম পড়ার ঝুঁকি
থাকে না এবং কাজ স্বচ্ছন্দে চলে। রাজমিস্ত্রিরা অনেক সময় অভিজ্ঞতা থেকে হিসাব
করলেও গাণিতিক হিসাব সবসময় অধিক নির্ভুল ফলাফল প্রদান করে থাকে।
৫. সিমেন্টের পরিমাণ বের করার সূত্র
শুকনো মশলার মোট আয়তনকে অনুপাতের যোগফল দিয়ে ভাগ করে সিমেন্টের ভাগ বের করা অনেক
সহজ পদ্ধতি। যদি আমরা ১:৫ অনুপাতে কাজ করি তবে অনুপাতের যোগফল হবে ১+৫ অর্থাৎ মোট
৬ ভাগ মশলা। এখন মোট শুকনো আয়তনকে ৬ দিয়ে ভাগ করলে যে মান পাওয়া যাবে তাই হলো
প্রয়োজনীয় সিমেন্টের আয়তন। যেহেতু সিমেন্ট বাজারে বস্তা হিসেবে পাওয়া যায়, তাই
আয়তনকে বস্তায় রূপান্তর করাটা আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে। সাধারণত ১.২৫ ঘনফুট
সিমেন্ট সমান এক বস্তা সিমেন্ট হিসেবে ধরা হয় নির্মাণ কাজের হিসাবের সুবিধার্থে।
এই গাণিতিক সূত্রটি ব্যবহার করলে যেকোনো পরিমাণ ইটের জন্য সিমেন্টের ব্যাগ সংখ্যা
সহজেই বের করা যায়। নির্ভুল হিসাবের জন্য ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা এবং প্রতিটি
ধাপ পুনরায় যাচাই করে নেয়া ভালো নির্মাণ কৌশল।
৬. ১০০০ ইটের জন্য সিমেন্টের বাস্তব হিসাব
প্র্যাকটিক্যাল হিসেবে দেখা যায় ১০০০ ইটের ৫ ইঞ্চি গাঁথুনির জন্য সাধারণত ৫ থেকে
৬ ব্যাগ সিমেন্ট লাগে। যদি ইটের আকার স্ট্যান্ডার্ড হয় এবং মশলার অনুপাত ১:৬ রাখা
হয় তবে ৫ ব্যাগ সিমেন্টেই কাজ হয়ে যায়। কিন্তু যদি মশলা একটু বেশি ঘন করা হয় বা
১:৪ অনুপাতে কাজ করা হয় তবে ৭ ব্যাগ পর্যন্ত লাগতে পারে। গাঁথুনির সময় মশলার অপচয়
কতটুকু হচ্ছে তার ওপরও সিমেন্টের এই ব্যাগ সংখ্যা কিছুটা কমবেশি হতে পারে। অনেক
সময় ইটের মান খারাপ হলে বা ইট বেশি পানি শোষণ করলে মশলা বেশি পরিমাণে খরচ হয়ে
থাকে। অভিজ্ঞ কন্সট্রাকশন ইঞ্জিনিয়াররা সবসময় ১০০০ ইটের জন্য গড়ে ৬ বস্তা সিমেন্ট
মজুত রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
এই পরিমাণটি মাথায় রাখলে নির্মাণ কাজ চলাকালীন হঠাৎ করে সিমেন্ট ফুরিয়ে যাওয়ার
বিড়ম্বনায় পড়তে হয় না।
৭. বালুর পরিমাণ নির্ণয় করা
সিমেন্টের হিসাবের পাশাপাশি সঠিক পরিমাণে বালু কেনা এবং ব্যবহার করা গাঁথুনির
শক্তির জন্য অপরিহার্য একটি বিষয়। ১:৫ অনুপাতে ১০০০ ইটের গাঁথুনির জন্য সাধারণত
২৫ থেকে ৩০ ঘনফুট বা সিএফটি বালুর প্রয়োজন পড়ে থাকে। বালু নির্বাচনের সময় লক্ষ্য
রাখতে হবে যেন এতে কাদা বা কোনো ধরনের জৈব ময়লা মিশ্রিত না থাকে। মোটা দানার বালু
বা সিলেট বালু গাঁথুনির জন্য ভালো হলেও খরচ কমাতে অনেকে লোকাল বালু ব্যবহার করেন।
বালু যদি খুব বেশি মিহি হয় তবে সিমেন্টের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে হয় যা নির্মাণের খরচ
বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সঠিক মানের বালু ব্যবহার করলে সিমেন্ট এবং বালু উভয়েরই
একটি ভারসাম্যপূর্ণ মিশ্রণ তৈরি করা সম্ভব হয়। প্রতি ব্যাগ সিমেন্টের সাথে ৫ বা ৬
ব্যাগ বালু মেপে দিলে হিসাব রাখা এবং কাজ করা সহজ হয়।
৮. পানির পরিমাণ ও মিশ্রণ প্রক্রিয়া
সিমেন্ট এবং বালুর মিশ্রণে সঠিক পরিমাণ পানি যোগ না করলে গাঁথুনির কাঙ্ক্ষিত
শক্তি বা স্ট্রেন্থ পাওয়া যায় না। অতিরিক্ত পানি দিলে মশলা পাতলা হয়ে যায় এবং ইট
থেকে গড়িয়ে পড়ে যা কাজের অপচয় ও দুর্বলতা তৈরি করে। আবার পানি কম হলে সিমেন্টের
রাসায়নিক বিক্রিয়া পূর্ণাঙ্গ হয় না এবং গাঁথুনি ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি
থাকে। ১০০০ ইটের জন্য মশলা তৈরির সময় বালু ও সিমেন্ট আগে শুকনো অবস্থায় খুব
ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হয়। এরপর ধীরে ধীরে পানি যোগ করে একটি নির্দিষ্ট ঘনত্বের
পেস্ট বা মশলা তৈরি করতে হয় যা সহজে কাজ করা যায়। দক্ষ রাজমিস্ত্রিরা মশলার আঠালো
ভাব দেখেই বুঝতে পারেন এতে পানির পরিমাণ ঠিক আছে কি না বা সিমেন্ট বাড়বে কি না।
পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিষ্কার এবং লবণমুক্ত পানি ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি
যাতে দেয়ালে নোনা না ধরে।
৯. গাঁথুনির সময় সতর্কতা ও টিপস
ইটের গাঁথুনি শুরু করার অন্তত কয়েক ঘণ্টা আগে ইটগুলোকে পর্যাপ্ত পানিতে ভিজিয়ে
রাখা নির্মাণ কাজের প্রধান শর্ত। শুকনো ইট মশলা থেকে পানি শুষে নেয় যার ফলে
সিমেন্ট তার জমাট বাঁধার শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং গাঁথুনি দুর্বল হয়।
১০০০ ইটের
গাঁথুনি একদিনে অনেক উঁচুতে না তুলে ধাপে ধাপে করা উচিত যাতে নিচের মশলা সেট
হওয়ার সময় পায়। সাধারণত একদিনে ৫ ফুটের বেশি উঁচু গাঁথুনি করা উচিত নয় কারণ এতে
নিচের ইটগুলো চাপে সরে যেতে পারে। গাঁথুনির প্রতি স্তরে ওলান বা লেভেল চেক করা
উচিত যাতে দেয়াল একদম সোজা এবং সুন্দর ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। জয়েন্টগুলো সমান
পুরুত্বের রাখলে দেখতে সুন্দর লাগে এবং সিমেন্টের অপচয়ও অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করা
সম্ভব হয় প্রতিদিনের কাজে।
১০. কিউরিং ও শেষ কথা
গাঁথুনি শেষ হওয়ার পর যথাযথ কিউরিং বা পানি ছিটানো সিমেন্টের কার্যকারিতা বাড়াতে
সবচাইতে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। সাধারণত গাঁথুনির ২৪ ঘণ্টা পর থেকে অন্তত ৭
থেকে ১০ দিন পর্যন্ত নিয়মিত পানি দিয়ে দেয়াল ভেজাতে হয়। কিউরিং ঠিকমতো না হলে
সিমেন্টের শক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় এবং দেয়ালের গায়ে চুল পরিমাণ
সূক্ষ্ম ফাটল দেখা দেয়। ১০০০ ইটের এই ছোট হিসাবটি বড় বড় প্রজেক্টের বাজেট তৈরিতে
এবং মালামাল ক্রয়ে প্রাথমিক ধারণা হিসেবে কাজ করে। সঠিকভাবে সিমেন্টের হিসাব
জানলে ঠিকাদার বা মিস্ত্রি আপনাকে অতিরিক্ত মালামাল কেনাতে বাধ্য করতে পারবে না
এবং সাশ্রয় হবে। আশা করি এই বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে আপনারা ইটের গাঁথুনিতে
সিমেন্টের হিসাব সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পেরেছেন।
১১.উপসংহার
একটি মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী দেয়াল নির্মাণের জন্য সিমেন্ট ও বালুর সঠিক অনুপাত
বজায় রাখা অপরিহার্য। ১০০০ ইটের গাঁথুনির এই হিসাবটি আপনাকে নির্মাণ সামগ্রী
কেনার আগে একটি স্বচ্ছ ধারণা দেবে, যা অপচয় রোধে সাহায্য করবে। মনে রাখবেন, কাজের
মান নিশ্চিত করতে দক্ষ রাজমিস্ত্রি এবং উন্নত মানের কাঁচামালের কোনো বিকল্প নেই।
সঠিক পরিকল্পনাই পারে আপনার স্বপ্নের বাড়িটিকে নিরাপদ ও সুন্দর করে তুলতে।



এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url