বুনো ফলের বীজ থেকে তেল নিষ্কাশনের দেশীয় উপায়
বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে অগণিত বুনো ফল ও ভেষজ উদ্ভিদ। নিম, কুসুম, মহুয়া,
রেড়ী (ক্যাস্টর) কিংবা তিতিজাম—এই ফলগুলো একসময় গ্রামীণ অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ
ছিল। কেবল খাদ্য হিসেবে নয়, এসব বুনো ফলের বীজ থেকে তেল নিষ্কাশনের কৌশল আমাদের
পূর্বপুরুষেরা রপ্ত করেছিলেন কয়েক শতাব্দী আগে। রাসায়নিকমুক্ত, পুষ্টিগুণে ভরপুর
এবং সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি এই তেল আজও চর্মরোগ নিরাময়, চুলের যত্ন এবং
জ্বালানি হিসেবে অনন্য। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগেও এই দেশীয় ঘরোয়া পদ্ধতিতে তেল
নিষ্কাশন কেবল একটি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি আমাদের লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।
বুনো ফলের বীজ থেকে তেল নিষ্কাশন আমাদের দেশের একটি প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্য।
আধুনিক যন্ত্রপাতির ভিড়ে এই দেশীয় পদ্ধতিগুলো কিছুটা আড়ালে চলে গেলেও,
স্বাস্থ্যগুণ এবং বিশুদ্ধতার দিক থেকে এগুলো আজও অতুলনীয়।আপনার জন্য এই বিষয়ের
ওপর একটি বিস্তারিত আর্টিকেল নিচে দেওয়া হলো:
পেজ সূচিপত্র:বুনো ফলের বীজ থেকে তেল নিষ্কাশনের দেশীয় উপায়
- প্রকৃতির অমূল্য দান বুনো ফলের বীজ
- সংগ্রহ ও সঠিক ফল নির্বাচনের কলাকৌশল
- বীজ শুকানো ও আর্দ্রতা রোধের প্রয়োজনীয়তা
- বীজের খোসা ছাড়ানো ও পরিষ্কারের কৌশল
- সনাতন পদ্ধতিতে বীজ ভাঙানো ও গুঁড়ো করা
- জলীয় বাষ্প বা তাপের পরিমিত ব্যবহার
- ঘানি বা কাঠের কল ব্যবহারের প্রাচীন প্রক্রিয়া
- তেল থিতানো ও ছাঁকনির সঠিক ব্যবহার
- সংরক্ষণ ও গুণাগুণ বজায় রাখার উপায়
- উপসংহার: ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ ও আধুনিকতা
১. প্রকৃতির অমূল্য দান বুনো ফলের বীজ
আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন বুনো গাছ থেকে পাওয়া বীজে লুকানো আছে
মহামূল্যবান ভেষজ তেল। সচরাচর আমরা যে আমলকী, বয়রা, মহুয়া বা নিম ফল দেখি তা
তেলের এক বিশাল ভাণ্ডার। প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামবাংলার মানুষ এসব বীজ থেকে তেল
বের করে রূপচর্চা ও চিকিৎসায় ব্যবহার করে আসছে। রাসায়নিক মিশ্রিত বাজারের তেলের
ভিড়ে এই দেশীয় ভোজ্য বা ভেষজ তেল অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ। সঠিক পদ্ধতিতে এই
তেল নিষ্কাশন করতে পারলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হতে পারে।
বুনো ফলের এসব বীজ সংগ্রহের মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে সঠিকভাবে
মূল্যায়ন করতে পারি অনায়াসে। মূলত এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক চর্চা যা প্রজন্ম থেকে
প্রজন্মে আমাদের ঐতিহ্যের বাহক হিসেবে কাজ করে। এই তেলের প্রতিটি ফোঁটা প্রকৃতির
বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য বহন করে যা কৃত্রিমতার কোনো ছোঁয়া ছাড়াই আমাদের কাছে পৌঁছায়।
আমাদের উচিত এই প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে চিনে নেওয়া এবং এদের বহুমুখী ব্যবহার
সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখা ও চর্চা করা।
তেল নিষ্কাশনের প্রথম ও প্রধান ধাপ হলো সঠিক এবং পরিপক্ক বুনো ফল বা বীজ সংগ্রহ
করা। কাঁচা বা আধাপাকা ফল থেকে তেলের গুণমান যেমন নষ্ট হয় তেমনি তেলের পরিমাণও
অনেক কম পাওয়া যায়। সাধারণত ফল গাছ থেকে নিজে নিজে মাটিতে পড়ার পর সংগ্রহ করা
সবচেয়ে উত্তম ও সহজ উপায়। ফলের আকার এবং ওজনের ওপর ভিত্তি করে বোঝা যায় এতে বীজের
ঘনত্ব বা তেলের পরিমাণ কেমন। নষ্ট বা পচে যাওয়া ফল বাদ দিয়ে কেবলমাত্র সতেজ ও
পোকা মুক্ত বীজগুলোই আলাদা করতে হবে। বুনো ফল সংগ্রহের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন
সেগুলো ধুলোবালি বা অতিরিক্ত ময়লাযুক্ত হয়ে নষ্ট না হয়। বৃষ্টির দিনে সংগৃহীত ফলে
ছত্রাকের আক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাই শুষ্ক আবহাওয়া এই কাজের জন্য আদর্শ।
সঠিক ফল নির্বাচনের ওপরই নির্ভর করে চূড়ান্ত পর্যায়ে তেলটি কতটা স্বচ্ছ এবং
সুগন্ধযুক্ত হবে বিশেষ করে। এই ধাপে অলসতা করলে পরবর্তীতে তেলের গুণমান বজায় রাখা
প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে যা খুবই জরুরি। তাই ধৈর্য নিয়ে একেকটি বীজ পর্যবেক্ষণ করে
বেছে নেওয়াই হবে একজন সফল তেল নিষ্কাশনকারীর প্রাথমিক সার্থকতা।
৩. বীজ শুকানো ও আর্দ্রতা রোধের প্রয়োজনীয়তা
সংগৃহীত বীজগুলো থেকে সফলভাবে তেল বের করার জন্য সেগুলোকে কড়া রোদে ভালোভাবে
শুকিয়ে নিতে হয়। বীজের ভেতর যদি সামান্য আর্দ্রতাও থেকে যায় তবে তেল নিষ্কাশনের
সময় তা পচে যাওয়ার ভয় থাকে। রোদে শুকানোর ফলে বীজের বাইরের আবরণ ভঙ্গুর হয়ে যায়
যা পরবর্তী প্রক্রিয়ায় খোসা ছাড়াতে সাহায্য করে। সাধারণত বীজগুলো পাতলা কাপড়ে
বিছিয়ে একটানা তিন থেকে চার দিন কড়া রোদে রাখা অত্যন্ত জরুরি কাজ। আর্দ্রতা মাপার
সহজ উপায় হলো বীজগুলো হাতে নিয়ে নাড়ালে যদি ঝনঝন শব্দ হয় তবে বুঝবেন। এই শুকানোর
প্রক্রিয়াটি তেলের স্থায়িত্ব বা শেলফ লাইফ বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে থাকে সব সময়। বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে বীজগুলো নিরাপদ ও শুষ্ক স্থানে
সরিয়ে রাখতে হবে যেন পুনরায় ভিজে না যায়। অতিরিক্ত তাপে আবার বীজের ভেতরের
প্রাকৃতিক তেলের গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে তাই খেয়াল রাখতে হবে। নিয়ন্ত্রিত
তাপমাত্রায় প্রাকৃতিক উপায়ে শুকানোই হলো সবচেয়ে সেরা দেশীয় পদ্ধতি যা যুগ যুগ ধরে
চলে আসছে গ্রামবাংলায়। সঠিকভাবে শুকানো বীজ থেকে তেলের ঘ্রাণ এবং স্থায়িত্ব উভয়ই
কয়েক গুণ বেড়ে যায় যা বাণিজ্যিকভাবেও খুব লাভজনক।
৪. বীজের খোসা ছাড়ানো ও পরিষ্কারের কৌশল
বীজ শুকানোর পর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো শক্ত খোসা ছাড়িয়ে ভেতরের শাঁসটি
বের করে আনা সাবধানে। দেশীয় পদ্ধতিতে ঢেঁকি বা কাঠের হাতুড়ি ব্যবহার করে বীজের
গায়ে হালকা আঘাত করে খোসা ফাটানো হয়ে থাকে। খেয়াল রাখতে হবে যেন ভেতরের শাঁসটি
চূর্ণবিচূর্ণ না হয় বরং যতটা সম্ভব অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসে সহজে। খোসা ছাড়ানোর
পর কুলা দিয়ে ঝেড়ে ময়লা এবং খোসার অবশিষ্টাংশগুলো ভালো করে পরিষ্কার করে নিতে হয়
দ্রুত। এই ধাপে পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখলে তেলের রঙ কালচে হয়ে যেতে পারে এবং
তিতকুটে ভাব আসতে পারে। পরিষ্কার শাঁসগুলোকে এরপর পুনরায় রোদে দিয়ে একদিনের জন্য
সামান্য গরম করে নেওয়াটা তেলের প্রবাহ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। অনেক সময় বুনো বীজের
গায়ে সূক্ষ্ম লোম বা আঁশ থাকে যা ঘষে পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি প্রক্রিয়া।
কোনোভাবেই যেন ধুলিকণা বীজের সাথে মিশ্রিত না থাকে সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে তেল
নিষ্কাশনকারীদের জন্য। বীজের গুণমান অক্ষুণ্ণ রাখতে এই পরিষ্কারকরণ পর্যায়টি
কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয় কারণ এটিই তেলের বিশুদ্ধতা বাড়ায়। পরিষ্কার
বীজগুলোই কেবল উন্নত মানের তেল উৎপাদনের নিশ্চয়তা দেয় যা আয়ুর্বেদিক বা রান্নার
কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।
আরো পড়ুন:ভার্নালাইজেশন বলতে কি বুঝায়
৫. সনাতন পদ্ধতিতে বীজ ভাঙানো ও গুঁড়ো করা
তেল বের করার প্রক্রিয়া সহজ করতে পরিষ্কার শাঁসগুলোকে প্রথমে মিহি করে গুঁড়ো করে
নিতে হয় এই পদ্ধতিতে। গ্রাম্য সমাজে পাথরের হামানদিস্তা বা বড় কাঠের উখলি ব্যবহার
করে বীজগুলো ভালো করে কুটে নেওয়া হয়ে থাকে।
গুঁড়ো করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন তা খুব বেশি মিহি না হয় আবার দানাদারও না
থাকে। একদম মিহি গুঁড়ো হলে তেল নিষ্কাশনের সময় কাপড়ের ছিদ্র দিয়ে কণাগুলো তেলের
সাথে মিশে গিয়ে ঘোলাটে করে। ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকিতেও এই কাজ করা যায় যা বীজের ওপর
সুষম চাপ সৃষ্টি করে গুণাগুণ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। বর্তমান সময়ে ছোট ছোট দেশীয়
যান্ত্রিক কল ব্যবহার হলেও হাতের স্পর্শে করা কাজের স্বাদ ও গুণ আলাদা। গুঁড়ো
করার সময় বীজের সুগন্ধ বের হতে শুরু করে যা তেলের বিশুদ্ধতার প্রাথমিক লক্ষণ
হিসেবে গণ্য হয়। এই চূর্ণগুলোকে একটি পাত্রে নিয়ে সামান্য একটু গরম জল ছিটিয়ে দলা
পাকিয়ে রাখা যায় পরবর্তী পর্যায়ের জন্য। গুঁড়ো করার পর বেশিক্ষণ খোলা বাতাসে ফেলে
রাখা ঠিক নয় কারণ এতে বাতাসের সংস্পর্শে এসে তেল নষ্ট হয়। দ্রুত পরবর্তী ধাপে চলে
যাওয়া তেলের সতেজতা বজায় রাখার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়
সবসময়।
৬. জলীয় বাষ্প বা তাপের পরিমিত ব্যবহার
গুঁড়ো করা বীজের শাঁস থেকে তেল আলগা করতে হালকা তাপ বা জলীয় বাষ্প ব্যবহারের
প্রথা খুব প্রাচীন। সরাসরি আগুনে না জ্বাল দিয়ে একটি বড় হাঁড়িতে জল ফুটিয়ে তার
ওপর ছাঁকনি রেখে ভাপ দেওয়া হয়। এই বাষ্পের তাপে বীজের কোষগুলো ফেটে যায় এবং ভেতর
থেকে তেল বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে দ্রুত। খুব বেশি উত্তাপ দিলে তেলের
ভিটামিন ও খনিজ উপাদান নষ্ট হয়ে যেতে পারে তাই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ জরুরি। বাষ্প
দেওয়ার সময় বীজের রঙ কিছুটা গাঢ় হয়ে আসে এবং একটি তৈলাক্ত চকচকে ভাব লক্ষ্য করা
যায়। এই প্রক্রিয়াটি তেলের ঘনত্ব ঠিক রাখে এবং নিষ্কাশনের সময় তেলের পরিমাণ
অনেকাংশেই বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করে থাকে। দেশীয় পদ্ধতিতে একে 'সেঁক দেওয়া' বলা হয়
যা তেলের দীর্ঘস্থায়ীত্বের জন্য অত্যন্ত কার্যকর একটি বিজ্ঞানসম্মত প্রাকৃতিক
উপায়। গরম অবস্থায় বীজগুলো চেপে তেল বের করা অনেক বেশি সহজ হয় ঠান্ডা বীজের
তুলনায় যা সবাই জানে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন অতিরিক্ত বাষ্পের কারণে বীজে আবার
অতিরিক্ত জলীয় কণা ঢুকে না পড়ে এ সময়। সঠিক সময়ে বাষ্প থেকে নামিয়ে দ্রুত
নিষ্কাশন যন্ত্র বা ঘানিতে নিয়ে যাওয়াই হলো এই ধাপের প্রধান কাজ।
৭. ঘানি বা কাঠের কল ব্যবহারের প্রাচীন প্রক্রিয়া
দেশীয় পদ্ধতিতে তেল নিষ্কাশনের সেরা উপায় হলো গরু বা মানুষের শক্তিতে চালিত
কাঠের ঐতিহ্যবাহী বলদ ঘানি। কাঠের ঘানিতে ঘর্ষণের ফলে উৎপন্ন হওয়া মৃদু তাপে
বীজের গুণমান অপরিবর্তিত থাকে এবং তেল হয় অত্যন্ত সুস্বাদু। ঘানির ভেতরের গর্তে
বাষ্পায়িত বীজের গুঁড়ো দিয়ে তার ওপর ভারী কাঠের দণ্ড বা 'লাঠ' ঘোরানো হতে থাকে।
ধীরগতিতে ঘোরার ফলে বীজের প্রতিটি কণা থেকে তেল নিংড়ে বেরিয়ে আসে এবং নিচের
পাত্রে জমা হতে থাকে। এই পদ্ধতিতে তেলের প্রোটিন ভেঙে যায় না বলে একে 'কোল্ড
প্রেসড' তেলের আদি সংস্করণ বলা যেতে পারে। যান্ত্রিক কলের তুলনায় ঘানির তেলে
ভিটামিন ই এবং অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অনেক বেশি পরিমাণে বজায় থাকে
স্বাস্থ্যকরভাবে। কাঠের ঘানি ব্যবহারের ফলে তেলে কোনো প্রকার ধাতব কণা বা
অপ্রীতিকর গন্ধ যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে না। তেলের নিষ্কাশনের এই প্রক্রিয়াটি
দীর্ঘসময়ের হলেও এর ফলাফল হয় বাজারের কেনা যে কোনো তেলের চেয়ে কয়েক গুণ ভালো।
গ্রামের সাধারণ মানুষ আজও বিশ্বাস করে ঘানির তেল শুধু খাবার নয় বরং অনেক রোগের
মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। ঘানি থেকে তাজা তেলের যে সুবাস বের হয় তা পুরো পরিবেশকে এক
মুহূর্তেই একদম সতেজ করে তোলে।
৮. তেল থিতানো ও ছাঁকনির সঠিক ব্যবহার
নিষ্কাশিত তেল ঘানি থেকে বের হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে কিছুটা ঘোলাটে এবং বীজের
সূক্ষ্ম অবশিষ্টাংশ যুক্ত থাকে তাতে। এই তেলকে স্বচ্ছ করার জন্য একটি পাত্রে
অন্তত চব্বিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টা স্থিরভাবে রেখে বা থিতিয়ে নিতে হয়। থিতানোর সময়
তেলের ভারী ময়লা বা তলানি পাত্রের নিচে জমা হয় এবং পরিষ্কার তেলটি ওপরে ভেসে ওঠে।
এরপর খুব সূক্ষ্ম সুতি কাপড় দিয়ে কয়েক স্তরে তেলটি ছেঁকে নিতে হয় যেন কোনো অশুচি
না থাকে। ছাঁকার সময় তাড়াহুড়ো করলে তেলের স্বচ্ছতা নষ্ট হতে পারে তাই এটি
ধীরস্থিরভাবে করার একটি ধৈর্যের কাজ বিশেষ। প্রয়োজনে দ্বিতীয়বার ছাঁকনি ব্যবহার
করা যেতে পারে যেন তেলের উজ্জ্বলতা একদম কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে দেখা দেয়। এই
প্রাকৃতিক পরিশোধন প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার কেমিক্যাল বা ব্লিচিং এজেন্ট ব্যবহার
করা হয় না যা শরীরের জন্য ভালো। দেশীয় উপায়ে তেল পরিষ্কার করার এই পদ্ধতিটি তেলের
প্রাকৃতিক স্বাদ ও গন্ধকে দীর্ঘকাল অটুট রাখতে সহায়তা করে। সঠিকভাবে ছাঁকা তেল
দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করলেও নিচে কোনো বাজে আস্তরণ পড়ে না এবং রান্নায় স্বাদ বাড়ায়
অনেক। বিশুদ্ধ তেলের রঙ এবং ঘ্রাণই বলে দেবে আপনার হাড়ভাঙা খাটুনি ও ধৈর্য আজ
কতটা সার্থক হয়েছে এই কাজে।
৯. সংরক্ষণ ও গুণাগুণ বজায় রাখার উপায়
তেল নিষ্কাশন ও পরিষ্কার করার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর সঠিক সংরক্ষণ
ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সবার আগে। প্লাস্টিকের পাত্রের বদলে কাঁচের বোতল বা
সিরামিকের জারে তেল রাখা সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর এবং পরিবেশবান্ধব একটি উপায়।
কাঁচের বোতলে রোদ লাগলে তেলের অক্সিডেশন হতে পারে তাই অন্ধকার ও শীতল স্থানে তেল
রাখা বাঞ্ছনীয় সব সময়। বোতলের মুখ খুব শক্ত করে আটকে রাখতে হবে যেন বাইরের বাতাস
বা আর্দ্রতা তেলের সংস্পর্শে না আসতে পারে। বুনো ফলের তেলের ঔষধি গুণ অনেক বেশি
থাকে তাই ছোট ছোট বোতলে ভরে রাখা ব্যবহারের জন্য সুবিধাজনক। তেলের স্থায়িত্ব
বাড়াতে অনেক সময় এতে সামান্য লবঙ্গ বা এক চিমটি লবণ দিয়ে রাখা যায় দেশীয় প্রথায়।
কোনোভাবেই ভেজা হাত বা অপরিষ্কার চামচ তেলের পাত্রে প্রবেশ করানো যাবে না কারণ
এতে তেল নষ্ট হয়। সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত তেল এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত অনায়াসেই
ভালো থাকে কোনো রকম দুর্গন্ধ হওয়া ছাড়াই। ব্যবহারের আগে বোতলটি হালকা ঝাঁকিয়ে
নিলে তেলের ঘনত্ব সমান থাকে যা রান্নায় বা ম্যাসাজে ভালো ফল দেয়। নিজস্ব পরিশ্রমে
উৎপাদিত এই তেল পরিবারের সদস্যদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে এক বিশাল ভূমিকা পালন
করবে নিঃসন্দেহে।
১০. উপসংহার: ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ ও আধুনিকতা
বুনো ফলের বীজ থেকে তেল নিষ্কাশনের এই দেশীয় পদ্ধতিগুলো আমাদের সমৃদ্ধ কৃষিজ
ঐতিহ্যের এক একটি সোনালী অধ্যায়। বর্তমানে বাজারে কৃত্রিম তেলের ভিড়ে যখন আমাদের
স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে তখন এই প্রাকৃতিক উপায়গুলো হতে পারে বিকল্প। যান্ত্রিক
সভ্যতার দাপটে আমরা আমাদের এই প্রাচীন জ্ঞানকে হারিয়ে ফেলছি যা ফিরিয়ে আনা
বর্তমান সময়ের বড় দাবি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এই পদ্ধতিগুলোকে আধুনিকায়ন করে
বাণিজ্যিকভাবে তেল উৎপাদন করলে গ্রামীণ বেকারত্ব দূর হবে। প্রকৃতির দেওয়া সম্পদের
সঠিক ব্যবহার করে আমরা বিষমুক্ত ভোজ্য ও ভেষজ তেলের চাহিদা নিজেরাই পূরণ করতে
পারি। প্রতিটি বুনো ফলই হতে পারে আমাদের সুস্বাস্থ্যের এক একটি উৎস যদি আমরা তার
সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ জানি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে
রাখতে প্রকৃতির এই দানকে যথাযথ সম্মান দেওয়া আমাদের কর্তব্য। আসুন আমরা পুনরায়
ফিরে যাই শেকড়ের টানে এবং আমাদের দেশীয় পদ্ধতিগুলোকে আবার সচল ও জীবন্ত করে তুলি।
এই তেলের প্রতিটি বিন্দুতে মিশে থাকুক আমাদের পরিশ্রম, ভালোবাসা এবং প্রকৃতির
অকৃত্রিম মমতা যা অতুলনীয় সবদিক থেকে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ পৃথিবী
গড়তে প্রাকৃতিক সম্পদের এই সদ্ব্যবহারই হবে আমাদের শ্রেষ্ঠ উপহার ও গর্ব।



এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url