যে প্রক্রিয়ায় খাদ্য স্থৈতিক শক্তি তাপ শক্তি রূপে মুক্ত হয় তাকে কি বলে
সৃষ্টির আদিকাল থেকেই শক্তির রূপান্তর মহাবিশ্বের একটি বিস্ময়কর ঘটনা। সবুজ
উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৌরশক্তিকে খাদ্যের মধ্যে রাসায়নিক
স্থৈতিক শক্তি হিসেবে জমা করে রাখে। কিন্তু এই স্থৈতিক শক্তি সরাসরি জীবনের কোনো
কাজে আসতে পারে না, যতক্ষণ না তা ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ঠিক যে
জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় জীবকোষে উপস্থিত জটিল খাদ্যবস্তু অক্সিজেনের
উপস্থিতিতে বা অনুপস্থিতিতে জারিত হয়ে ভেঙে যায় এবং খাদ্যে নিহিত শক্তি তাপ ও
গতিশক্তি (ATP) রূপে মুক্ত হয়, তাকেই শ্বসন বলা হয়। এটি জীবনের সেই ইঞ্জিন, যা
প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে শক্তির জোগান দিয়ে চলেছে।
যে প্রক্রিয়ায় জীবকোষে সঞ্চিত স্থৈতিক শক্তি (Potential Energy) ভেঙে তাপ ও
গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়, তাকে এক কথায় শ্বসন (Respiration) বলে। এটি প্রতিটি
জীবন্ত কোষের একটি অপরিহার্য বিপাকীয় প্রক্রিয়া।
আপনার জন্য এই বিষয়ের ওপর একটি সুন্দর এবং তথ্যবহুল আর্টিকেল নিচে দেওয়া হলো:
পেজ সূচিপত্র:যে প্রক্রিয়ায় খাদ্য স্থৈতিক শক্তি তাপ শক্তি রূপে মুক্ত হয় তাকে কি বলে
১. ভূমিকা: প্রাণের স্পন্দন ও শক্তি
পৃথিবীর প্রতিটি জীবন্ত কোষে শক্তির প্রয়োজন যা প্রাণচাঞ্চল্য বজায় রাখতে
প্রধান ভূমিকা পালন করে। জীবজগত মূলত সূর্যালোক থেকে প্রাপ্ত শক্তিকে খাদ্যের
মধ্যে রাসায়নিক স্থৈতিক শক্তি হিসেবে সঞ্চয় করে রাখে। এই সঞ্চিত শক্তি সরাসরি
কোষের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে না যতক্ষণ না তা মুক্ত হয়। শ্বসন হলো সেই
অত্যাবশ্যকীয় জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়া যা এই জটিল খাদ্যকে ভেঙে শক্তি নির্গত
করে। প্রতিটি নিশ্বাস ও প্রতিটি কোষের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়া এই প্রক্রিয়ার ওপর
সরাসরি গভীরভাবে নির্ভরশীল থাকে। উদ্ভিদ হোক বা প্রাণী, সবার দেহেই শক্তির এই
রূপান্তর অবিরাম গতিতে চলতে থাকে প্রতিনিয়ত। যদি কোনো কারণে এই শক্তি উৎপাদন
প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় তবে জীবনের সমাপ্তি ঘটে। তাই জীবের অস্তিত্ব টিকিয়ে
রাখতে শ্বসন প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম এবং এটি প্রাণিজগতের মূল ভিত্তি। আধুনিক
বিজ্ঞান এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এর
রহস্য উন্মোচন করেছে। জীবনের প্রতিটি স্পন্দনের পেছনে লুকিয়ে আছে খাদ্যের সেই
লুকানো শক্তির অত্যন্ত নিপুণ বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
২. শ্বসনের সংজ্ঞা ও মূল ধারণা
শ্বসন বলতে আমরা সাধারণত শ্বাস-প্রশ্বাস বুঝি কিন্তু জৈব পরিভাষায় এটি কোষের
ভেতরের একটি প্রক্রিয়া। এটি এমন একটি বিপাকীয় প্রক্রিয়া যেখানে কোষ মধ্যস্থ
জটিল খাদ্যবস্তু অক্সিজেনের উপস্থিতিতে জারিত হয়। এই জারণের ফলে খাদ্যের
রাসায়নিক বন্ধনীগুলো ভেঙে যায় এবং প্রচুর পরিমাণে শক্তি উৎপন্ন হয়ে থাকে।
উৎপন্ন এই শক্তি মূলত তাপ শক্তি এবং গতিশক্তি হিসেবে আমাদের দেহের বিভিন্ন কাজে
লাগে। এই প্রক্রিয়ায় উপজাত হিসেবে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং জল উৎপন্ন হয়ে কোষ
থেকে নির্গত হয়। মূলত এনজাইম বা উৎসেচকের সহায়তায় এই দীর্ঘ ও জটিল রাসায়নিক
বিক্রিয়াগুলো ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়। স্থৈতিক শক্তি যখন গতিশক্তিতে রূপান্তরিত
হয় তখনই জীব তার দৈনন্দিন চলাফেরা ও কাজ করতে পারে। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে
ক্যাটাবোলিক বা অপচিতিমূলক বিপাক হিসেবে অভিহিত করা হয় কারণ এতে শক্তি মুক্তি
ঘটে। সবাত ও অবাত— এই দুই প্রধান ভাগে শ্বসনকে ভাগ করা যায় যা পরিবেশের ওপর
নির্ভর করে। মোটের ওপর শ্বসন হলো খাদ্যের অন্তর্নিহিত শক্তিকে ব্যবহারযোগ্য করে
তোলার একটি প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক কৌশল।
৩. কোষীয় শ্বসন ও শক্তির উৎস
কোষীয় শ্বসন মূলত সাইটোপ্লাজম এবং মাইটোকন্ড্রিয়ার অভ্যন্তরে অত্যন্ত
সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে প্রতিটি মুহূর্তে। খাদ্যের প্রধান উপাদান গ্লুকোজ
যখন কোষের ভেতরে প্রবেশ করে তখন থেকেই এই রূপান্তর শুরু হয়। মাইটোকন্ড্রিয়াকে
কোষের শক্তিঘর বলা হয় কারণ এখানেই শক্তির সিংহভাগ উৎপন্ন হয়ে সঞ্চিত হতে থাকে
সারাক্ষণ। অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট বা ATP হলো কোষের শক্তির মুদ্রা যা শ্বসনের
মাধ্যমে তৈরি হয়ে থাকে প্রতিনিয়ত। যখনই শরীরের কোনো কাজে শক্তির প্রয়োজন হয়
তখন এই ATP ভেঙে গিয়ে প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে। কার্বোহাইড্রেট ছাড়াও
প্রোটিন এবং ফ্যাট জাতীয় খাদ্যবস্তুও বিশেষ প্রক্রিয়ায় শ্বসন বস্তুরূপে
ব্যবহৃত হতে পারে। কোষের ভেতরে অক্সিজেনের প্রাপ্যতা এই প্রক্রিয়ার গতি ও ধরন
নির্ধারণে একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। সূর্যালোকের যে শক্তি সালোকসংশ্লেষণে
সঞ্চিত হয়েছিল তা এখানে এসে অবশেষে মুক্তি লাভ করে সফলভাবে। শক্তি মুক্ত হওয়ার
এই ধারাবাহিকতা জীবকে পরিবেশের প্রতিকূলতার মাঝেও বেঁচে থাকার রসদ যুগিয়ে থাকে
সর্বদা। কোষীয় স্তরে এই শক্তির রূপান্তর না ঘটলে কোনো জৈবিক ক্রিয়াই সঠিকভাবে
সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। তাই কোষীয় শ্বসন জীবনের শক্তির আধার হিসেবে পরিচিত যা
প্রতিটি একক কোষকে সজীব ও সচল রাখে।
৪. সবাত শ্বসনের ধাপসমূহ
সবাত শ্বসন প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের উপস্থিতিতে গ্লুকোজ সম্পূর্ণভাবে জারিত হয়ে
বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করে থাকে। এই প্রক্রিয়াটি চারটি প্রধান পর্যায়ে
বিভক্ত যা কোষের বিভিন্ন অংশে ক্রমান্বয়ে সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপ হলো
গ্লাইকোলাইসিস যা কোষের সাইটোপ্লাজমে ঘটে এবং অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় না এই
স্তরে। দ্বিতীয় ধাপ হলো অ্যাসিটাইল কো-এ সৃষ্টি যা গ্লাইকোলাইসিস ও ক্রেবস
চক্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। তৃতীয় ধাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাকে ক্রেবস
চক্র বলা হয় এবং এটি মাইটোকন্ড্রিয়ার ভেতরে সম্পন্ন হয়। চতুর্থ এবং শেষ ধাপ
হলো ইলেকট্রন পরিবহন তন্ত্র যেখানে প্রচুর পরিমাণে ATP এবং তাপ শক্তি নির্গত হয়।
প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট কিছু এনজাইম কাজ করে যা বিক্রিয়ার গতিকে নিয়ন্ত্রণ ও
ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় এক অণু গ্লুকোজ থেকে ৩৮টি
ATP অণু উৎপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে আদর্শভাবে। সবাত শ্বসন উন্নত মানের জীবদের
জন্য শক্তির প্রধান উৎস কারণ এটি সর্বোচ্চ পরিমাণ শক্তি প্রদান করে। এই
প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বায়ুমণ্ডলীয় অক্সিজেন গ্রহণ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড
ত্যাগের চক্রটি জীবদেহে পূর্ণতা পায়।
৫. গ্লাইকোলাইসিস: শক্তির প্রথম ধাপ
গ্লাইকোলাইসিস হলো শ্বসনের এমন এক ধাপ যা সবাত ও অবাত উভয় প্রকার শ্বসনের
ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় এক অণু গ্লুকোজ বিভিন্ন বিক্রিয়ার মাধ্যমে
ভেঙে দুই অণু পাইরুভিক অ্যাসিডে পরিণত হয়।
এই ধাপটি সম্পন্ন হতে কোষের কোনো
বিশেষ অঙ্গাণু লাগে না বরং এটি সাইটোপ্লাজমে সরাসরি ঘটে। এই পর্যায়ে অক্সিজেনের
প্রত্যক্ষ প্রয়োজন হয় না বলেই এটি অত্যন্ত প্রাচীন একটি জৈবিক প্রক্রিয়া
হিসেবে গণ্য। গ্লাইকোলাইসিসে নিট দুই অণু ATP এবং দুই অণু NADH উৎপন্ন হয় যা
পরবর্তী ধাপের জন্য প্রয়োজনীয়। এই ধাপটিকে এমডেন-মেয়ারহফ-পারনাস বা EMP পথ বলা
হয় বিজ্ঞানীদের নামানুসারে যারা এটি আবিষ্কার করেছেন। কোষের শক্তির চাহিদার ওপর
ভিত্তি করে এই ধাপের বিক্রিয়ার গতি কম বা বেশি হতে পারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে।
পাইরুভিক অ্যাসিড তৈরির মাধ্যমে কোষ তার পরবর্তী জটিল ধাপগুলোর জন্য নিজেকে
প্রস্তুত করে নেয় এই স্তরে। যদি অক্সিজেন না থাকে তবে এই পাইরুভিক অ্যাসিড থেকে
সন্ধান বা গেঁজিয়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে অক্সিজেনের উপস্থিতিতে এটি
মাইটোকন্ড্রিয়ায় প্রবেশ করে শক্তির মহাযজ্ঞ শুরু করার জন্য সম্পূর্ণভাবে
প্রস্তুত থাকে। তাই গ্লাইকোলাইসিসকে শক্তি উৎপাদনের প্রবেশদ্বার বা প্রাথমিক
ভিত্তি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়।
৬. ক্রেবস চক্র ও ইলেকট্রন পরিবহন
ক্রেবস চক্র হলো শ্বসনের সবচেয়ে জটিল ও বৈচিত্র্যময় পর্যায় যা
মাইটোকন্ড্রিয়ার ম্যাট্রিক্সে প্রতিনিয়ত সম্পাদিত হয়। স্যার হ্যান্স ক্রেবস এই
চক্রটি আবিষ্কার করেন বলে তার সম্মানে এটিকে ক্রেবস চক্র হিসেবে নামকরণ করা
হয়েছে। এই চক্রে অ্যাসিটাইল কো-এ প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন জৈব অ্যাসিড তৈরির
মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। এখান থেকে প্রচুর পরিমাণে উচ্চ শক্তি
সম্পন্ন ইলেকট্রন বাহক যেমন NADH এবং FADH2 উৎপন্ন হয়ে থাকে। পরবর্তী পর্যায়ে
ইলেকট্রন পরিবহন তন্ত্রে এই বাহকগুলো থেকে ইলেকট্রন স্থানান্তরের মাধ্যমে বিপুল
শক্তি নির্গত হয়। এই ধাপেই মূলত কোষের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের অধিকাংশ ব্যবহৃত
হয় এবং শেষ পর্যন্ত জল উৎপন্ন হয়ে থাকে। মাইটোকন্ড্রিয়ার ক্রিস্টিতে থাকা
বিশেষ কিছু প্রোটিন এই ইলেকট্রন পরিবহনের কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা
করে। এই প্রক্রিয়ার শেষ প্রান্তে এসে অক্সিডেটিভ ফসফোরাইলেশন পদ্ধতিতে অজৈব
ফসফেট থেকে ATP অণু তৈরি হয়। এই পুরো ব্যবস্থাটি একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো কাজ
করে যেখানে জ্বালানি হিসেবে খাদ্য ব্যবহৃত হয় প্রতিদিন। ক্রেবস চক্র এবং
ইলেকট্রন পরিবহন তন্ত্রের সফল সমাপ্তিই জীবের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়
প্রাণশক্তি নিশ্চিত করে।
৭. অবাত শ্বসন ও এর গুরুত্ব
অবাত শ্বসন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে খাদ্যবস্তু
আংশিকভাবে জারিত হয়ে শক্তি উৎপন্ন করে। সাধারণত নিম্নশ্রেণীর জীব যেমন ইস্ট বা
কিছু ব্যাকটেরিয়াতে এই ধরনের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া দেখা যায় নিয়মিত। এই
প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ পুরোপুরি ভাঙে না বলে সবাত শ্বসনের তুলনায় অনেক কম পরিমাণ
শক্তি উৎপন্ন হয়। মানুষের পেশীকোষেও কঠোর পরিশ্রমের সময় সাময়িকভাবে অক্সিজেনের
অভাব হলে অবাত শ্বসন বা ল্যাকটিক অ্যাসিড সন্ধান ঘটে। এর ফলে পেশিতে ল্যাকটিক
অ্যাসিড জমা হয় যা আমাদের ক্লান্তিবোধ বা পেশিতে ব্যথার অন্যতম কারণ হিসেবে
পরিচিত। অ্যালকোহল শিল্পে ইস্টের অবাত শ্বসন বা সন্ধান প্রক্রিয়াকে
বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ব্যবহার করা হয়। পাউরুটি তৈরিতে কার্বন
ডাই-অক্সাইডের যে বুদবুদ দেখা যায় তা এই অবাত শ্বসনেরই একটি বাহ্যিক ফলাফল
মাত্র। যদিও এটি কম ফলপ্রসূ তবুও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এটি একটি
অনন্য প্রাকৃতিক কৌশল হিসেবে কাজ করে। অনেক পরজীবী জীব যারা অক্সিজেনের অভাবযুক্ত
পরিবেশে বাস করে তাদের জন্য এটিই একমাত্র বেঁচে থাকার উপায়। সুতরাং প্রকৃতির
ভারসাম্য রক্ষায় এবং নির্দিষ্ট কিছু জৈবিক প্রয়োজনে অবাত শ্বসন তার নিজস্ব
গুরুত্ব বজায় রাখে।
৮. শ্বসনের প্রভাবকসমূহ
শ্বসন প্রক্রিয়াটি বিভিন্ন বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ প্রভাবকের ওপর সরাসরি নির্ভর
করে যা এর গতি নির্ধারণ করে দেয়। তাপমাত্রার পরিবর্তন শ্বসনের হারের ওপর ব্যাপক
প্রভাব ফেলে কারণ এটি এনজাইমের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সর্বদা। সাধারণত
২০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শ্বসন প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে ভালোভাবে
এবং দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয়। অক্সিজেনের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেলে সবাত শ্বসনের হার
বাড়ে আবার অক্সিজেন কমে গেলে এটি হ্রাস পেতে শুরু করে। কোষের ভেতরে সঞ্চিত খাদ্য
বা শ্বসন বস্তুর পরিমাণ যত বেশি হবে শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনাও তত বৃদ্ধি পাবে।
জলের উপস্থিতিও এই প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরি কারণ সব এনজাইমীয় বিক্রিয়া
জলীয় মাধ্যমেই সুষ্ঠুভাবে ঘটে। আলোর উপস্থিতি সরাসরি প্রভাব না ফেললেও
পরোক্ষভাবে খাদ্য তৈরির মাধ্যমে শ্বসনকে প্রভাবিত করে প্রতিটি দিন। কার্বন
ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব খুব বেশি বেড়ে গেলে শ্বসনের গতি মন্থর হয়ে যেতে পারে যা
একটি সীমাবদ্ধতা। কোষের বয়স এবং হরমোনের প্রভাবও এই প্রক্রিয়াটিকে জীবদেহের
প্রয়োজন অনুযায়ী কম বা বেশি করতে সাহায্য করে। এই সবকটি উপাদানের সঠিক সমন্বয়ই
জীবের জীবনচক্রকে সচল এবং স্থিতিশীল রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।
৯. শারীরবৃত্তীয় গুরুত্ব ও স্থায়িত্ব
শ্বসন কেবল শক্তি উৎপাদনের উপায় নয় বরং এটি কোষের ভেতরকার ভারসাম্য বা
হোমিওস্ট্যাসিস বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এই প্রক্রিয়ায় যে তাপ উৎপন্ন হয় তা
আমাদের দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
জীবদেহের বৃদ্ধি, প্রজনন এবং ক্ষত নিরাময়ের মতো কাজে যে শক্তির প্রয়োজন হয় তা
এখান থেকেই আসে। শ্বসনের মাধ্যমে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড উদ্ভিদ গ্রহণ করে
আবার সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন তৈরি করে যা একটি চক্র। এই
প্রক্রিয়াটি প্রাণিকুলের অস্তিত্ব রক্ষার পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয়
উপাদানের সমতা রক্ষায় বিশেষভাবে কাজ করে থাকে। খনিজ লবণ শোষণ এবং প্রোটিন
সংশ্লেষণের মতো বিপাকীয় কাজগুলো এই শক্তির সাহায্যেই সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয়
প্রতিনিয়ত। কোষ বিভাজনের সময় ডিএনএ প্রতিলিপিকরণে যে বিপুল শক্তির প্রয়োজন তা
এই কোষীয় শ্বসনই নিশ্চিত করে থাকে। এমনকি উদ্ভিদের রস উত্তোলন ও চলাচলের
ক্ষেত্রেও এই রাসায়নিক শক্তি যান্ত্রিক শক্তির যোগান দিয়ে থাকে সর্বদা। জীবনের
প্রতিটি ছোট থেকে বড় কাজের পেছনে এই শক্তির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ একটি নীরব কারিগর
হিসেবে কাজ করে। তাই শারীরবৃত্তীয় সুস্থতা এবং দীর্ঘস্থায়ী জীবনের জন্য শ্বসন
প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক কার্যকারিতা থাকা একান্তই অপরিহার্য একটি শর্ত।
১০. উপসংহার: জীবনের রসায়ন
পরিশেষে বলা যায় যে শ্বসন হলো জীবজগতের সেই জাদুকরী প্রক্রিয়া যা নির্জীব
খাদ্যকে সজীব শক্তিতে রূপান্তর করে। এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন দহন প্রক্রিয়া যা
আগুনের মতো দ্রুত না হলেও জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আলোকিত করে রাখে। খাদ্যের
স্থৈতিক শক্তি যখন তাপ ও গতিশক্তিতে মুক্ত হয় তখন থেকেই একটি প্রাণের বাহ্যিক
প্রকাশ ঘটে। প্রকৃতির এই অনন্য প্রকৌশল ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা
করা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না কোনোদিন। আমরা যা খাই এবং আমরা যেভাবে চলি তার
মাঝখানের সেতুবন্ধন হলো এই জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়ার সমষ্টি। আধুনিক চিকিৎসা
বিজ্ঞান এবং জৈবপ্রযুক্তি শ্বসনের এই মূলনীতিকে ব্যবহার করে অনেক জটিল রোগের
সমাধান খুঁজছে। প্রতিটি নিশ্বাসের সাথে আমরা যে অক্সিজেন গ্রহণ করি তা আমাদের
কোষের ভেতরে এক অপার সম্ভাবনার জন্ম দেয়। স্থৈতিক শক্তি থেকে তাপ শক্তিতে এই
রূপান্তরই হলো সৃষ্টির অন্যতম রহস্য এবং জীবনের শাশ্বত সত্যের এক রূপ। প্রকৃতির
নিয়মে এই শক্তির আদান-প্রদান চলতে থাকবে যতদিন এই নীল গ্রহে প্রাণের শেষ স্পন্দন
টুকু অবশিষ্ট থাকবে। জীবনের এই মৌলিক রসায়নটি বোঝা আমাদের অস্তিত্বের গভীরতা
অনুধাবন করার জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ।



এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url