জলাশয়ের শত্রু: জলজ আগাছা দমনের কার্যকর উপায়

নদী, নালা, পুকুর বা বিল—যেকোনো জলাশয়ের স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান বজায় রাখার জন্য পানির গুণাগুণ ঠিক থাকা অপরিহার্য। তবে অনেক সময় জলাশয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ জন্মে, যা পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দেয় এবং মাছের বৃদ্ধিতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদগুলোই হলো জলজ আগাছা। কচুরিপানা, টোপাপানা বা শ্যাওলার মতো আগাছাগুলো জলাশয়ের অক্সিজেন কমিয়ে দেয় এবং সূর্যের আলো প্রবেশে বাধা দেয়। তাই পুকুর বা জলাশয়কে উৎপাদনক্ষম ও স্বাস্থ্যকর রাখতে জলজ আগাছা দমন অত্যন্ত জরুরি।
জলাশয়ের শত্রু জলজ আগাছা
জলজ আগাছা আমাদের জলাশয়, পুকুর বা কৃষিজমির জন্য অনেক সময় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এটি পানির গুণমান নষ্ট করে এবং মাছের বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। আপনার অনুরোধ অনুযায়ী জলজ আগাছা দমনের বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি সুন্দর আর্টিকেল নিচে দেওয়া হলো:

পেজ সূচিপত্র:জলাশয়ের শত্রু: জলজ আগাছা দমনের কার্যকর উপায়

​১. জলাশয়ের শত্রু: জলজ আগাছা পরিচিতি

​জলাশয়ের স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা ব্যাহত করতে জলজ আগাছার ভূমিকা অত্যন্ত প্রকট হিসেবে গণ্য করা হয়। সাধারণত কচুরিপানা, টোপাপানা, চিলিম ও বিভিন্ন শ্যাওলা জলাশয়ের উপরিভাগ ঢেকে ফেলে সূর্যের আলো আটকায়। এই আগাছাগুলো পানির পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে দ্রুত বংশবিস্তার করে মাছের খাদ্যে ভাগ বসায়। অনেক ক্ষেত্রে এরা পানির দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে মাছের জন্য মারাত্মক শ্বাসকষ্ট সৃষ্টি করে। বিশেষ করে আবদ্ধ জলাশয়ে এদের উপদ্রব বেশি দেখা যায় যা মাছের বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। আগাছা দমনের সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে মাছ চাষে লোকসানের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যেতে পারে। জলজ উদ্ভিদ মূলত তিন ধরণের হয়: ভাসমান, নিমজ্জিত এবং কিনারায় জন্মানো শক্ত শেকড়যুক্ত আগাছা। প্রতিটি প্রকারের আগাছার জন্য আলাদা আলাদা দমন পদ্ধতির প্রয়োজন হয় যা চাষিদের জানা জরুরি। সঠিকভাবে আগাছা শনাক্ত করা দমনের প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয় সব মাছ চাষিদের জন্য। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে পুরো জলাশয় এই শত্রুদের দখলে চলে যেতে খুব অল্প সময় নেয়। তাই জলাশয়কে শক্রমুক্ত রাখতে এদের জীবনচক্র সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান থাকা প্রতিটি খামারির আবশ্যকতা।

​২. বাস্তুতন্ত্রের ওপর আগাছার নেতিবাচক প্রভাব

​জলজ আগাছা কেবল মাছের শত্রু নয় বরং এটি পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রকে ভারসাম্যহীন করে তোলে। অত্যধিক আগাছা জন্মালে পানির নিচে থাকা উপকারী প্লাঙ্কটন তৈরির প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সূর্যের আলো পৌঁছাতে না পারায় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং পানি দূষিত হতে থাকে। মরা আগাছা পানির নিচে পচে গিয়ে অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের সৃষ্টি করতে পারে। এই বিষাক্ত গ্যাস মাছের মড়ক সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে অনেক সময় দেখা দেয়। জলাশয়ের পানির পিএইচ মান পরিবর্তন করে এরা জলজ প্রাণীর টিকে থাকাকে কঠিন করে তোলে। এছাড়াও ঘন আগাছার ভেতরে সাপ, ব্যাঙ বা ক্ষতিকারক পোকা আশ্রয় নিয়ে মাছের পোনা খায়। পানির স্বচ্ছতা নষ্ট হয় এবং এটি দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে দ্রুত। একটি আদর্শ পুকুরের মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এলাকা আগাছা মুক্ত রাখা উচিত। অন্যথায় মাছের বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি একেবারে থমকে যেতে পারে। তাই জলাশয়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় আগাছা নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত সকল চাষির।

​৩. কায়িক বা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে আগাছা পরিষ্কার

​আগাছা দমনের সবচেয়ে নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব উপায় হলো কায়িক শ্রম বা যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার। ছোট আকারের পুকুরে বাঁশের লগি বা টানা জাল ব্যবহার করে ভাসমান আগাছা তোলা যায়। নিমজ্জিত আগাছা পরিষ্কারের জন্য বিশেষ ধরণের কাঁটা বা হুক ব্যবহার করা বেশ কার্যকর হয়। এই পদ্ধতিতে কোনো বিষক্রিয়ার ভয় থাকে না এবং পানির গুণগত মান সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ থাকে। তবে এটি বেশ শ্রমসাধ্য কাজ এবং বড় জলাশয়ের জন্য অনেক সময় ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। যান্ত্রিক হারভেস্টার বা আধুনিক মেশিন ব্যবহার করে বড় বিলে কচুরিপানা পরিষ্কার করা এখন সম্ভব। নিয়মিত ব্যবধানে হাত দিয়ে আগাছা টেনে তুললে এদের বংশবিস্তার করার সুযোগ অনেক কমে যায়। কিনারার আগাছা কাঁচি বা কাস্তে দিয়ে কেটে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা সবচেয়ে ভালো উপায়। বৃষ্টির মৌসুমে যখন আগাছা দ্রুত বাড়ে তখন লোকবল বাড়িয়ে দ্রুত পরিষ্কার করা উচিত হবে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিষ্কার করার পর উত্তোলিত আগাছাগুলো পাড় থেকে দূরে নিরাপদ স্থানে ফেলা। নতুবা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে পুনরায় বীজ জলাশয়ে ফিরে এসে আবার নতুন সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এই পদ্ধতিটি কিছুটা সময়সাপেক্ষ হলেও দীর্ঘমেয়াদে জলাশয়ের জন্য এটিই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর সমাধান হিসেবে গণ্য।

​৪. জৈবিক নিয়ন্ত্রণ: প্রাকৃতিক সমাধান

​জৈবিক পদ্ধতিতে আগাছা দমন বর্তমান সময়ে টেকসই মৎস্য চাষের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নির্দিষ্ট কিছু মাছ রয়েছে যারা খাবারের উৎস হিসেবে জলজ আগাছাকে পছন্দ করে থাকে প্রধানত। গ্রাস কার্প মাছ জলজ ঘাস এবং নরম আগাছা খেয়ে পুকুর পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও সরপুঁটি বা নাইলোটিকা মাছ শ্যাওলা ও ছোট ছোট পানা দমনে বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখে। সঠিক অনুপাতে এসব মাছ মজুদ করলে আগাছার উপদ্রব প্রাকৃতিকভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে। কোনো কোনো দেশে নির্দিষ্ট প্রজাতির পোকা বা উইভিল ব্যবহার করে কচুরিপানা ধ্বংস করা হয়। এটি কোনো ধরণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই আগাছার বংশবিস্তার রোধ করার একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক উপায়। তবে এই পদ্ধতিতে ফলাফল পেতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয় যা ধৈর্য ধরে পর্যবেক্ষণ করা। মাছের মাধ্যমে আগাছা দমনে বাড়তি কোনো খরচ হয় না বরং মাছের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে। পুকুরের তলার আগাছা দমনে ম্রিগেল বা কার্পিও মাছও পরোক্ষভাবে বেশ ভালো সাহায্য করে থাকে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে শত্রুকে বন্ধুতে রূপান্তর করার এটিই সবচেয়ে সহজ কার্যকর কৌশল বলা যায়। এই পদ্ধতিতে চাষিদের যেমন খরচ বাঁচে তেমনি মাছের উৎপাদনশীলতা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

​৫. রাসায়নিক দমন পদ্ধতির সতর্কতা ও প্রয়োগ

জলাশয়ের শত্রু জলজ আগাছা
যান্ত্রিক বা জৈবিক উপায়ে সফল না হলে শেষ উপায় হিসেবে রাসায়নিক পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়। আগাছানাশক ব্যবহার করার আগে এর মাত্রা এবং মাছের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। তামা সালফেট বা ব্লু-ভিট্রিওল শ্যাওলা দমনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে অনেক বছর ধরে। তবে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য এবং মাছ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রাসায়নিক প্রয়োগের সময় পানির পরিমাণ এবং আগাছার ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে ডোজ নির্ধারণ করা। মেঘলা দিনে বা বৃষ্টির সময় বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। সাধারণত সকালে রোদের তীব্রতা বাড়লে আগাছানাশক স্প্রে করলে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া যেতে পারে। ব্যবহারের পর মৃত আগাছাগুলো অবশ্যই পানি থেকে তুলে ফেলতে হবে নতুবা পচন শুরু হবে। পচনের ফলে পানির অক্সিজেন কমে গিয়ে মাছের মৃত্যু হতে পারে যা চাষির ক্ষতির কারণ। অনুমোদিত এবং পরিবেশবান্ধব আগাছানাশক নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ হবে। রাসায়নিক পদ্ধতি দ্রুত ফল দিলেও এটি কেবল চরম সংকটের সময় ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সঠিক সচেতনতা ছাড়া এর প্রয়োগ করলে হিতে বিপরীত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায় সব সময়।

​৬. পানির গভীরতা ও তলদেশ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব

​জলাশয়ের গভীরতা এবং তলদেশের গঠন আগাছা জন্মানোর ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে নিয়মিত। অগভীর পানিতে সূর্যের আলো সহজেই তলদেশে পৌঁছায় ফলে নিমজ্জিত আগাছা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ পায়। পুকুরের গভীরতা কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ ফুট বজায় রাখলে তলদেশের আগাছা কমে যায়। পুকুর তৈরির সময় তলদেশ সমান করা এবং অতিরিক্ত কাদা সরিয়ে ফেলা দমন কৌশলের অংশ। কাদা বেশি থাকলে সেখানে আগাছার শেকড় শক্তভাবে গেঁথে থাকে এবং বারবার জন্মানোর সুযোগ পায়। প্রতি বছর বা দুই বছর অন্তর পুকুর শুকিয়ে রোদ লাগানো আগাছা দমনের মোক্ষম উপায়। রোদে মাটির ক্ষতিকর জীবাণু মরে যায় এবং আগাছার বীজগুলো চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় সহজে। এরপর তলায় চুন প্রয়োগ করলে পানির অম্লতা ঠিক থাকে এবং আগাছা জন্মানো ব্যাহত হয়। গভীরতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পানির তাপমাত্রাও স্থিতিশীল রাখা সম্ভব যা মাছের জন্য বেশ আরামদায়ক। যে সব স্থানে সূর্যের আলো সরাসরি পড়ে না সেখানে আগাছার প্রকোপ সাধারণত কিছুটা কম থাকে। বাঁধ বা পাড় উঁচুকরণ ও সংস্কার করলে বাইরের আগাছার বীজ ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। সঠিকভাবে তলদেশ ব্যবস্থাপনা করলে রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন অনেকাংশেই কমে আসে এবং মাছের স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

​৭. পুষ্টি উপাদান নিয়ন্ত্রণ ও আগাছা রোধ

​জলাশয়ে অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতিকে 'ইউট্রোফিকেশন' বলা হয় যা আগাছার প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে পানির নাইট্রোজেন এবং ফসফরাস বেড়ে গেলে শ্যাওলা ও পানা দ্রুত বাড়তে থাকে। জমিতে ব্যবহৃত সার বৃষ্টির পানির সাথে পুকুরে মিশলে এই সমস্যার সৃষ্টি হতে দেখা যায়। এছাড়াও মাছের উচ্ছিষ্ট খাদ্য এবং বিষ্ঠা পানির তলায় জমে পুষ্টির ঘনত্ব অনেক বাড়িয়ে দেয়। পুকুরের পাড়ে বেশি বড় গাছ থাকলে পচা পাতা পড়েও পানির পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। নিয়মিত আংশিক পানি পরিবর্তন করলে পুষ্টির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং আগাছার বৃদ্ধি কমে যায়। সঠিক পরিমাণে মাছের সম্পূরক খাদ্য প্রদান করলে অপচয় কম হয় এবং পানি ভালো থাকে। সার প্রয়োগের আগে পানির গুণগত মান পরীক্ষা করে নেওয়া একজন আধুনিক চাষির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পানির উপরিভাগ পরিষ্কার রাখা এবং অতিরিক্ত জৈব সার ব্যবহার বন্ধ করা আগাছা রোধে কার্যকর। জলাশয়ের চারপাশে যদি কোনো ড্রেন বা নর্দমা থাকে তবে তার সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া। পুষ্টির সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে আগাছা জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ আর জলাশয়ে বিদ্যমান থাকতে পারে না একদম। এর ফলে মাছের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় এবং পুকুরের রোগবালাই হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে আসে।

​৮. মৌসুমি রক্ষণাবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতা

​ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে জলজ আগাছার ধরণের পরিবর্তন ঘটে এবং এদের বিস্তার ভিন্ন ভিন্ন হয়। বর্ষাকালে উজান থেকে পানা ও আগাছা ভেসে আসার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায় সবখানে। তাই বর্ষার আগে পুকুরের ইনলেট ও আউটলেটে জাল বা নেট দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে হবে। শীতকালে পানির স্তর কমে গেলে তলদেশের আগাছা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে যা ক্ষতিকর। এই সময়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে আগাছা ছোট থাকতেই উপড়ে ফেলা সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায়। আগাছা ফুল আসার আগেই দমন করা উচিত কারণ একবার বীজ ছড়িয়ে পড়লে নিয়ন্ত্রণ কঠিন। প্রতিটি মৌসুমে একবার করে পুকুরের তলদেশ পরীক্ষা করা এবং পরিষ্কার করার রুটিন থাকা জরুরি। আগাম সতর্কতা হিসেবে পুকুর পাড়ের লম্বা ঘাস কেটে ছোট রাখা উচিত যেন তা পানিতে না পড়ে। অনেক সময় পাখির মাধ্যমেও আগাছার বীজ এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ছোটখাটো আগাছা দেখা মাত্রই অবহেলা না করে তা সরিয়ে ফেলার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। একটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জলাশয় মাছের জন্য অভয়ারণ্য হয়ে ওঠে এবং ফলন বাড়িয়ে দিতে পারে। মৌসুমি পরিকল্পনা থাকলে অল্প পরিশ্রমেই সারা বছর জলাশয়কে শক্রমুক্ত রাখা সম্ভব হয় সব চাষির পক্ষে।

​৯. স্থানীয় মাছ চাষিদের সচেতনতা বৃদ্ধি

​জলাশয়ের আগাছা দমন কেবল একক প্রচেষ্টায় নয় বরং গোষ্ঠীগত সচেতনতার মাধ্যমে সফল হওয়া সম্ভব। পাড়ার বা এলাকার সকল পুকুর মালিক যদি একসাথে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায় তবে ফলাফল ভালো হয়
জলাশয়ের শত্রু জলজ আগাছা
কারণ একটি আক্রান্ত পুকুর থেকে অন্য পুকুরে বীজ বা পোকা খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি বা বেসরকারি মৎস্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দমনের আধুনিক পদ্ধতিগুলো শিখতে হবে। সচেতনতামূলক সভার মাধ্যমে আগাছার কুফল এবং এটি দমনের সঠিক উপায়গুলো প্রচার করা বেশ দরকার। আগাছানাশক ব্যবহারে পরিবেশের ক্ষতি সম্পর্কে স্থানীয় কৃষকদের সচেতন করা একটি অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব। অনেক ক্ষেত্রে অব্যবহৃত পরিত্যক্ত পুকুর আগাছার আঁতুড়ঘর হিসেবে কাজ করে যা দমনে পদক্ষেপ নেওয়া। এই পুকুরগুলো সংস্কারের মাধ্যমে পুনরায় মাছ চাষের আওতায় আনা হলে আগাছার উপদ্রব কমে যাবে। তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশ রক্ষায় এবং আধুনিক মৎস্য চাষে উদ্বুদ্ধ করতে সেমিনার আয়োজন করা যেতে পারে। আগাছা দমনের সহজ টিপস সম্বলিত লিফলেট বিতরণ করলে সাধারণ চাষিরা দ্রুত তথ্য পেতে পারে। সমন্বিত প্রচেষ্টায় জলাশয়গুলো পরিষ্কার রাখলে এলাকার মৎস্য সম্পদ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উভয়ই বৃদ্ধি পায়। সচেতনতাই হচ্ছে আগাছা দমনের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং স্থায়ী হাতিয়ার যা দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনে।

​১০. উপসংহার: টেকসই জলাশয় ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ

​জলাশয় আমাদের অমূল্য সম্পদ এবং একে আগাছামুক্ত রাখা আমাদের নৈতিক ও পেশাগত বড় দায়িত্ব। টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আগাছা দমন করলে মাছের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায় যা অর্থনীতিতে যোগ হয়। আধুনিক বিজ্ঞান ও দেশীয় প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে জলাশয়কে উৎপাদনশীল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আগাছা দমনের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন পানি ও পরিবেশের কোনো অপূরণীয় ক্ষতি না হয়। রাসায়নিকের চেয়ে জৈবিক এবং যান্ত্রিক পদ্ধতিগুলো অগ্রাধিকার দিলে প্রকৃতির সাথে আমাদের বন্ধুত্ব টিকে থাকে। প্রতিটি চাষির উচিত নিজ নিজ জলাশয়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিনিয়ত সজাগ দৃষ্টি রাখা এবং পরিচর্যা করা। আগাছা দমনের মাধ্যমে কেবল মাছের চাষ নয় বরং জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও আমরা বড় অবদান রাখতে পারি। একটি স্বচ্ছ ও নীল পানির জলাশয় সুন্দর পরিবেশের প্রতীক এবং সমৃদ্ধির একটি বড় উৎস। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দূষণমুক্ত এবং আগাছামুক্ত জলাশয় উপহার দেওয়া আমাদের সকলের সম্মিলিত একটি লক্ষ্য। সঠিক জ্ঞান, পরিশ্রম এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার জলাশয়কে আগাছার হাত থেকে রক্ষা করার মূল চাবিকাঠি। এই প্রচেষ্টাই নিশ্চিত করবে আমাদের মৎস্য শিল্পের স্থায়ী সফলতা এবং একটি সুন্দর আগামীর সুস্থ সুন্দর পরিবেশ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url