নিডোব্লাস্ট ও কোলোব্লাস্টের মধ্যে সাদৃশ্য কী
সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল জলে ভেসে বেড়ানো জেলিফিশ কিংবা চিরুনি-জেলি (Comb jelly)
দেখতে শান্ত মনে হলেও এরা দক্ষ শিকারি। জেলিফিশের (নিডারিয়া) কর্ষিকায় থাকে
বিষাক্ত নিডোব্লাস্ট কোষ, আর চিরুনি-জেলি বা টিনোফোরদের অস্ত্র হলো আঠালো
কোলোব্লাস্ট কোষ। যদিও বিবর্তনগত দিক থেকে এই দুই পর্বের প্রাণীদের মধ্যে
পার্থক্য রয়েছে, তবুও শিকার ধরা এবং আত্মরক্ষার তাগিদে তাদের শরীরে এমন কিছু
বিশেষায়িত কোষের উদ্ভব হয়েছে যা কার্যকারিতার দিক থেকে একে অপরের পরিপূরক। এই
কোষগুলো মূলত প্রাণীদের চলনহীন বা ধীরগতির হওয়া সত্ত্বেও দ্রুতগামী শিকার ধরার
সক্ষমতা দান করে।
প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগতে টিকে থাকার জন্য প্রতিটি প্রাণীর রয়েছে নিজস্ব
আত্মরক্ষণ এবং খাদ্য সংগ্রহের কৌশল। বিশেষ করে সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী
অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই কৌশলগুলো বেশ বিস্ময়কর। নিডারিয়া (Cnidaria)
এবং টিনোফোরা (Ctenophora) পর্বের প্রাণীদের মধ্যে এমন দুটি বিশেষ ধরনের কোষ
পাওয়া যায় যারা গঠনগতভাবে ভিন্ন হলেও কাজের দিক থেকে দারুণ কিছু সাদৃশ্য বহন করে।
এগুলো হলো নিডোব্লাস্ট (Cnidoblast) এবং কোলোব্লাস্ট (Colloblast)।এই নিবন্ধে
আমরা এই দুই কোষের মধ্যবর্তী আকর্ষণীয় সাদৃশ্যগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
পেজ সূচিপত্র:নিডোব্লাস্ট ও কোলোব্লাস্টের মধ্যে সাদৃশ্য কী
১. কোষীয় প্রকৃতির অভিন্নতা
নিডোব্লাস্ট এবং কোলোব্লাস্ট উভয়ই হলো প্রাণিরাজ্যের অত্যন্ত বিশেষায়িত এবং
রূপান্তরিত কিছু কোষীয় কাঠামো যা নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদনের জন্য গঠিত। এই কোষগুলো
মূলত অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের শরীরের বিশেষ অংশে অবস্থান করে তাদের জীবনধারণের মৌলিক
চাহিদাগুলো পূরণ করতে সাহায্য করে থাকে। উভয় কোষই প্রোটোপ্লাজমীয় উপাদান দ্বারা
পূর্ণ থাকে এবং এদের কেন্দ্রে একটি সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস বিদ্যমান থাকে যা কোষের
কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এদের কোষীয় গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এরা উভয়ই আদিম
বহুকোষী প্রাণীদের বিবর্তনের ধারায় বিকশিত হয়েছে। সাধারণত এই কোষগুলো উদ্দীপনায়
সাড়া দিতে সক্ষম এবং নির্দিষ্ট কোনো উত্তেজনার ফলে দ্রুত নিজেদের অভ্যন্তরীণ
উপাদান বাইরে নিক্ষেপ করতে পারে। কোষের ভেতরে থাকা বিশেষ থলি বা ভেসিকল উভয়
ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে যা এদের সাদৃশ্যের ভিত্তি।
গঠনগতভাবে এরা স্বতন্ত্র হলেও কোষীয় মৌল বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এদের মধ্যে এক গভীর
যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায়। এই কোষগুলোর উপস্থিতি প্রমাণ করে যে ভিন্ন ভিন্ন পর্বের
প্রাণীরা পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে একই ধরনের কৌশল গ্রহণ করেছে।
২. শিকার ধরার সাধারণ উদ্দেশ্য
নিডারিয়া এবং টেনোফোরা উভয় পর্বের প্রাণীরাই মূলত মাংসাশী এবং তাদের বেঁচে থাকার
জন্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জলজ প্রাণীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিডোব্লাস্ট ও
কোলোব্লাস্ট উভয় কোষেরই প্রধান এবং প্রাথমিক কাজ হলো শিকারকে সফলভাবে ধরা এবং
তাকে নিয়ন্ত্রণে আনা। শিকার যখন এই প্রাণীদের সংস্পর্শে আসে তখন এই কোষগুলো
সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শিকারকে পলায়নে বাধা প্রদান করে। নিডোব্লাস্ট বিষাক্ত
হিপনোটক্সিন প্রয়োগ করে শিকারকে অবশ করে ফেলে আর কোলোব্লাস্ট আঠালো পদার্থ দিয়ে
শিকারকে আটকে ফেলে। পদ্ধতিগত ভিন্নতা থাকলেও লক্ষ্যটি একই আর তা হলো
প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য সংগ্রহ করে পুষ্টির চাহিদা মেটানো এবং টিকে থাকা। উভয় কোষই
অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কাজ করে যাতে শিকার কোনোভাবেই আত্মরক্ষার সুযোগ না পায় এবং
সহজেই খাদ্য হিসেবে গৃহীত হয়। সমুদ্রের প্রতিকূল পরিবেশে এই শিকার ধরার সক্ষমতাই
এদেরকে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। এদের কার্যকারিতা
ছাড়া এই দুই পর্বের প্রাণীদের অস্তিত্ব রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত বলে
বিজ্ঞানীরা মনে করেন। তাই উদ্দেশ্যগত বিচারে এই দুই কোষকে একে অপরের পরিপূরক বা
সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত ও বিজ্ঞানসম্মত।
৩. বহিঃত্বকীয় অবস্থানের সাদৃশ্য
এই বিশেষায়িত কোষ দুটির অবস্থানগত সাদৃশ্য লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এরা উভয়ই
প্রাণীর দেহের বাইরের স্তরে অবস্থিত। নিডোব্লাস্ট কোষগুলো নিডারিয়া পর্বের
প্রাণীদের এক্টোডার্ম বা বহিঃত্বক স্তরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে থাকে যা তাদের প্রথম
প্রতিরক্ষা স্তর। একইভাবে কোলোব্লাস্ট কোষগুলো টেনোফোরা পর্বের প্রাণীদের
বহিঃত্বকীয় এপিডার্মিস স্তরে অবস্থান করে যা বাহ্যিক উদ্দীপনা গ্রহণে সহায়ক হয়।
শরীরের একদম বাইরের স্তরে থাকার কারণে এরা শিকারের সংস্পর্শে আসা মাত্রই
প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে এবং দ্রুত সক্রিয় হয়। এই কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করে যে
কোনো শত্রু বা শিকার দেহের স্পর্শে এলে তা সরাসরি এই কোষগুলোর মুখে পড়বে। শরীরের
গভীরে না থেকে একদম প্রান্তে থাকার ফলে এদের কর্মক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং
শক্তির অপচয় রোধ হয়। বহিঃত্বকের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে যেমন মুখে বা কর্ষিকায়
এদের ঘনত্ব অনেক বেশি থাকে যা এদের কাজের দক্ষতার পরিচায়ক। এই কোষগুলোর বহিঃস্থ
বিন্যাস প্রমাণ করে যে এরা প্রাণীর বাহ্যিক পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়া করার জন্য
বিশেষভাবে অভিযোজিত হয়েছে। প্রকৃতির এই নিখুঁত প্রকৌশল দুই ভিন্ন পর্বের প্রাণীর
ক্ষেত্রে প্রায় একই রকম ভাবে কাজ করতে দেখা যায়।
৪. অঙ্গাণু নির্গমনের কৌশলগত মিল
নিডোব্লাস্ট এবং কোলোব্লাস্ট উভয় কোষের ভেতরেই একটি বিশেষ ধরনের সুত্রক বা থ্রেড
সদৃশ অঙ্গাণু প্যাঁচানো অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে। যখন কোনো বাহ্যিক উদ্দীপনা
কোষটিকে আঘাত করে তখন এই প্যাঁচানো সূত্রকটি প্রচণ্ড চাপে কোষের বাইরে নিক্ষিপ্ত
হয়। নিডোব্লাস্টের ক্ষেত্রে একে নিমাটোসিস্ট বলা হয় যা শিকারের দেহে বিঁধে গিয়ে
বিষ ঢেলে দেয় এবং শিকারকে নিস্তেজ করে। কোলোব্লাস্টের ক্ষেত্রে একটি সর্পিলাকার
সূত্রক থাকে যা আঠালো কণিকা নিয়ে শিকারের গায়ে আঠার মতো জড়িয়ে যায় দ্রুত। উভয়
ক্ষেত্রেই এই নির্গমন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত এবং চাপের পরিবর্তনের মাধ্যমে
নিয়ন্ত্রিত হয় যা জীববিজ্ঞানের এক বিস্ময়। সূত্রক নিক্ষেপের এই সাধারণ মেকানিজম
বা কৌশলটি উভয় কোষের মধ্যেই একটি মৌলিক সাদৃশ্য তৈরি করেছে যা অনন্য। কোষের
অভ্যন্তরে জমা থাকা শক্তি মুহূর্তের মধ্যে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে
সূত্রকটিকে বাইরে ঠেলে বের করে দেয়। এই দ্রুত গতির কারণে শিকার নিজেকে বাঁচানোর
সুযোগ পায় না এবং খুব সহজেই প্রাণীর কবলে চলে আসে। যদিও নির্গত পদার্থের প্রকৃতি
ভিন্ন তবুও নিক্ষেপ করার মৌলিক প্রক্রিয়াটি উভয় কোষের ক্ষেত্রেই প্রায় অভিন্ন এবং
কার্যকর।
৫. সংবেদনশীলতার সাধারণ বৈশিষ্ট্য
উভয় কোষই বাহ্যিক পরিবেশের পরিবর্তন বা উদ্দীপনার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং
দ্রুত সাড়া দিতে সক্ষম এক বিশেষ ব্যবস্থা। নিডোব্লাস্টে একটি সংবেদনশীল রোম বা
'নিডোসিল' থাকে যা ট্রিগারের মতো কাজ করে এবং সামান্য স্পর্শে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
কোলোব্লাস্টেও অনুরূপ সংবেদনশীল কাঠামো থাকে যা শিকারের উপস্থিতি বুঝতে পারলে
কোষীয় প্রতিক্রিয়া শুরু করার সংকেত প্রদান করে। এই সংবেদনশীলতা প্রাণীদের সাহায্য
করে বুঝতে যে কখন তাদের শক্তি ব্যয় করে শিকার ধরার চেষ্টা করতে হবে। স্পর্শ বা
রাসায়নিক উদ্দীপনা উভয়ই এই কোষগুলোকে উদ্দীপ্ত করতে পারে যা এদের জীবনযাপনের জন্য
খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশের সামান্যতম কম্পন বা কোনো জৈব পদার্থের উপস্থিতি এই
কোষগুলোর গ্রাহক যন্ত্র সহজেই শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। এই উদ্দীপনা গ্রহণ ও তা
কার্যকর করার ক্ষমতা উভয় কোষকে এক অনন্য জৈবিক মারণাস্ত্রে পরিণত করেছে
প্রকৃতিতে। সংবেদনশীলতার এই মিলটি নির্দেশ করে যে উভয় কোষই অত্যন্ত উন্নত মানের
স্নায়বিক বা রাসায়নিক সংকেত ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। তাই উদ্দীপনা গ্রহণের ক্ষেত্রে
এদের কার্মিক সাদৃশ্য বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিশেষ গবেষণার বিষয় হিসেবে পরিগণিত
হয়েছে।
৬. একবার ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা
নিডোব্লাস্ট এবং কোলোব্লাস্ট কোষের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং
বিয়োগান্তক সাদৃশ্য হলো এদের এককালীন ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা। একবার যদি একটি
নিডোব্লাস্ট কোষ তার নিমাটোসিস্ট নিক্ষেপ করে ফেলে তবে সেই কোষটি আর পুনরায়
ব্যবহার করা যায় না। একইভাবে একটি কোলোব্লাস্ট কোষ একবার শিকার ধরার জন্য ব্যবহৃত
হয়ে গেলে তা তার কার্যকারিতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে। ব্যবহারের পর এই কোষগুলো
সাধারণত নষ্ট হয়ে যায় অথবা প্রাণী দেহ থেকে খসে পড়ে যায় যা এক ধরণের আত্মত্যাগ।
অর্থাৎ প্রতিটি শিকার ধরার প্রচেষ্টায় প্রাণীকে তার নির্দিষ্ট সংখ্যক কার্যকরী
কোষ স্থায়ীভাবে বিসর্জন দিতে হয় নিয়মিত। এটি একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া কারণ নতুন
কোষ তৈরি করতে প্রাণীর প্রচুর পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয় সারাক্ষণ। তাসত্ত্বেও এই
আত্মঘাতী কৌশলটি শিকার ধরার জন্য এতটাই কার্যকর যে বিবর্তনের ধারায় এটি টিকে
রয়েছে। এই এককালীন ব্যবহারের বৈশিষ্ট্যটি উভয় কোষের মধ্যে একটি সাধারণ
জীবনবৃত্তীয় সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে যা বেশ বিরল। কোষগুলোর এই সীমাবদ্ধতা থাকা
সত্ত্বেও এদের বিপুল সংখ্যা ও দ্রুত পুনরুৎপাদন ক্ষমতা প্রাণীকে বিপদে পড়তে দেয়
না।
৭. কোষীয় প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া
যেহেতু নিডোব্লাস্ট এবং কোলোব্লাস্ট কোষগুলো একবার ব্যবহারের পর নষ্ট হয়ে যায়
তাই এদের নিয়মিত প্রতিস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। নিডারিয়া প্রাণীদের
ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ থেকে নতুন নিডোব্লাস্ট কোষ তৈরি হয়ে শূন্যস্থান পূরণ করে দেয়
খুব দ্রুত। একইভাবে টেনোফোরা প্রাণীদের ক্ষেত্রেও বিশেষ ধরনের স্টেম সেল বা আদি
কোষ থেকে নতুন কোলোব্লাস্ট কোষের উৎপত্তি ঘটে। এই নিরন্তর প্রতিস্থাপন
প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত করে যে প্রাণীটি যেন সবসময় শিকার ধরার জন্য প্রস্তুত থাকে সব
সময়। কোষ বিভাজনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন কোষ তৈরি হওয়া এবং পুরনো বা ব্যবহৃত
কোষের স্থান দখল করা একটি সাধারণ সাদৃশ্য। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে
সম্পন্ন হয় যাতে প্রাণীর রক্ষাকবচে কোনো ধরনের ফাঁক বা দুর্বলতা তৈরি না হয়। কোষ
তৈরির এই কারখানাগুলো প্রাণীর দেহের নির্দিষ্ট কিছু অংশে সারাক্ষণ সক্রিয় থাকে
এবং নতুন কোষ সরবরাহ করে। এই প্রতিস্থাপন ক্ষমতার কারণেই এই প্রাণীরা দীর্ঘ সময়
ধরে অনাহারে থাকলেও তাদের শিকার ধরার সক্ষমতা হারায় না। সুতরাং নতুন কোষ তৈরির এই
জৈবিক ধারাটি উভয় প্রাণীর জীবনচক্রে এক অভিন্ন ও অপরিহার্য অংশ হিসেবে কাজ করে।
৮. কর্ষিকার ওপর ঘন সন্নিবেশ
নিডারিয়া এবং টেনোফোরা উভয় পর্বের প্রাণীদের মধ্যেই কর্ষিকা বা টেনটাকলস নামক
বিশেষ লম্বা অঙ্গাণু দেখতে পাওয়া যায়। এই কর্ষিকাগুলোর ওপরেই মূলত নিডোব্লাস্ট
এবং কোলোব্লাস্ট কোষগুলো সবচেয়ে ঘনভাবে এবং সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো অবস্থায় থাকে।
কর্ষিকাগুলো যখন জলের স্রোতে দুলতে থাকে তখন এই কোষগুলো শিকারের জন্য এক ধরণের
মরণফাঁদ তৈরি করে রাখে। যেহেতু কর্ষিকাগুলো অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে
তাই এই কোষগুলো অনেক বড় এলাকা জুড়ে শিকার খুঁজতে পারে। কর্ষিকার গায়ে ব্যাটারির
মতো এই কোষগুলো দলবদ্ধভাবে অবস্থান করে যা এদের কার্যকারিতা অনেক বাড়িয়ে দেয়
বহুগুণ। কোনো ক্ষুদ্র প্রাণী কর্ষিকার সংস্পর্শে আসামাত্রই শত শত নিডোব্লাস্ট বা
কোলোব্লাস্ট কোষ একত্রে আক্রমণ শুরু করে। এই সামষ্টিক আক্রমণের ফলে শিকারের
বাঁচার সম্ভাবনা একদম শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং খাদ্য নিশ্চিত হয়। কর্ষিকার ওপর
এই কোষীয় বিন্যাস এদের শিকার ধরার কৌশলের একটি প্রধান এবং সাধারণ গাঠনিক মিল
হিসেবে স্বীকৃত। প্রকৃতির এই বিশেষ বিন্যাস এদেরকে সমুদ্রের তলদেশে দক্ষ শিকারি
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে যা খুবই বিস্ময়কর।
৯. বিবর্তনীয় অভিযোজন ও গুরুত্ব
নিডোব্লাস্ট এবং কোলোব্লাস্ট হলো বিবর্তনের ইতিহাসে অভিযোজনের এক অনন্য উদাহরণ
যা ভিন্ন ভিন্ন পূর্বপুরুষ থেকে এলেও একই কাজ করে।
বিজ্ঞানীরা একে সমবৃত্তীয় বা
এনালগাস অঙ্গের একটি চমৎকার উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন প্রায়শই। উভয় কোষই
প্রমাণ করে যে সমুদ্রের ভাসমান পরিবেশে টিকে থাকতে হলে শিকার ধরার জন্য বিশেষায়িত
অঙ্গাণুর প্রয়োজন হয়। এদের গঠনগত জটিলতা এবং কাজের নিখুঁত সমন্বয় এটাই নির্দেশ
করে যে এরা দীর্ঘ সময় ধরে পরিমার্জিত হয়েছে। যদিও নিডারিয়া এবং টেনোফোরা দুটি
আলাদা পর্ব তবুও এদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের ধরণ প্রায় একই রকম। এই কোষগুলোর
উপস্থিতি প্রাণীদের প্রতিকূল পরিবেশে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করে এবং বাস্তুসংস্থানে
ভারসাম্য বজায় রাখে। যদি এই কোষগুলো না থাকত তবে এই কোমলদেহী প্রাণীরা সমুদ্রের
অন্যান্য খাদকদের হাত থেকে বাঁচতে পারত না। এদের বিবর্তনীয় গুরুত্ব এতটাই বেশি
যে এদের নামানুসারেই অনেক সময় এই প্রাণীদের পরিচয় নির্ধারিত হয়ে থাকে। এই
কোষগুলোর সাদৃশ্য মূলত প্রকৃতির একটি বিশেষ সমস্যার দুটি প্রায় সমমানের সমাধান যা
বিবর্তনের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
১০. উপসংহার: প্রকৃতির অনন্য সৃষ্টি
পরিশেষে বলা যায় যে নিডোব্লাস্ট এবং কোলোব্লাস্ট কোষ দুটি নিডারিয়া ও টেনোফোরা
পর্বের প্রাণীদের জন্য আশীবার্দ স্বরূপ। এদের মধ্যে শিকার ধরার উদ্দেশ্য কৌশলগত
অবস্থান এবং এককালীন ব্যবহারের যে সাদৃশ্য রয়েছে তা সত্যিই বিস্ময়কর ও বৈজ্ঞানিক
ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও নিডোব্লাস্ট বিষাক্ত হিপনোটক্সিন ব্যবহার করে এবং
কোলোব্লাস্ট আঠালো পদার্থ ব্যবহার করে তবুও তাদের লক্ষ্য অভিন্ন। এই কোষগুলো
জীববিজ্ঞানের পাতায় বিশেষ স্থান দখল করে আছে কারণ এদের কার্যপদ্ধতি অত্যন্ত জটিল
এবং চমৎকার। শিকার ধরার এই অসাধারণ জৈবিক প্রযুক্তি আজ অবধি বিজ্ঞানীদের গবেষণার
এক আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে। এদের সাদৃশ্যগুলো মূলত জীবন
সংগ্রামের এক অভিন্ন গল্প তুলে ধরে যা কোটি কোটি বছর ধরে চলে আসছে। প্রকৃতি
কীভাবে তার সন্তানদের ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে একই লক্ষ্য অর্জনে সাহায্য করে তা এই
কোষগুলো দেখলেই বোঝা যায়। সুতরাং নিডোব্লাস্ট ও কোলোব্লাস্টের মধ্যে থাকা এই
মিলগুলো কেবল নামমাত্র নয় বরং এগুলো গভীর বিবর্তনীয় সম্পর্কের প্রতীক। এই অনন্য
কোষীয় কাঠামোগুলো জলজ বাস্তুসংস্থানের স্থায়িত্ব বজায় রাখতে এবং জীববৈচিত্র্য
রক্ষায় বিশাল ভূমিকা পালন করে।



এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url