হিজড়া বা ইন্টারসেক্স কারা? হিজরা সন্তান কেন হয়?হিজড়া কি জিনদের সন্তান
হিজড়া বা ইন্টারসেক্স (Intersex) হওয়া নিয়ে আমাদের সমাজে অসংখ্য ভুল ধারণা এবং
কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি ভ্রান্ত ধারণা হলো—হিজড়া সন্তানরা
"জিনের সন্তান"। বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার অভাবে এই ধরনের অবাস্তব
ধারণাগুলো মানুষের মনে গেঁথে গেছে।
নিচে হিজড়া সন্তান হওয়ার প্রকৃত কারণ, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং প্রচলিত
কুসংস্কারের ব্যবচ্ছেদ করে একটি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
পেজ সূচিপত্র: হিজড়া বা ইন্টারসেক্স কারা? হিজরা সন্তান কেন হয়?হিজড়া কি জিনদের সন্তান?
১.হিজড়া বা ইন্টারসেক্স কারা? (পরিচয় ও সংজ্ঞা)
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হিজড়া বা ইন্টারসেক্স বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝানো হয়,
যাদের শারীরিক লিঙ্গ বৈশিষ্ট্য (যেমন: জননাঙ্গ, প্রজনন গ্রন্থি বা ক্রোমোজোম
বিন্যাস) পুরুষ বা নারীর প্রচলিত সংজ্ঞার সাথে পুরোপুরি মেলে না। এটি কোনো অভিশাপ
নয়, বরং একটি জৈবিক বৈচিত্র্য।
হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডারের পার্থক্য
অনেকে হিজড়া এবং ট্রান্সজেন্ডারকে এক করে ফেলেন, যা ভুল:
* ইন্টারসেক্স (হিজড়া): এটি জন্মগত শারীরিক অবস্থা।
* ট্রান্সজেন্ডার: এটি মানসিক লিঙ্গ পরিচয়। একজন মানুষ শারীরিকভাবে পুরুষ
হয়ে জন্মালেও নিজেকে মনে মনে নারী ভাবতে পারেন (বা এর উল্টো)।
২.হিজড়া সন্তান কেন হয়? (বৈজ্ঞানিক কারণ)
প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণসমূহ:
* ক্রোমোজোমাল অস্বাভাবিকতা: শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর মিলনের সময় যদি
ক্রোমোজোমের সংখ্যায় পরিবর্তন ঘটে (যেমন: XXY, XYY, বা শুধু X), তবে শিশুর
শারীরিক গঠনে অস্পষ্টতা দেখা দেয়। একে 'ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম' বা 'টার্নার
সিনড্রোম' বলা হয়।
* হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: গর্ভাবস্থায় যদি মায়ের শরীরে হরমোনের অস্বাভাবিক
নিঃসরণ ঘটে অথবা শিশু নির্দিষ্ট হরমোনে সাড়া না দেয় (Androgen Insensitivity
Syndrome), তবে লিঙ্গ নির্ধারণী অঙ্গগুলো সঠিকভাবে বিকশিত হয় না।
* কনজেনিটাল অ্যাড্রিনাল হাইপারপ্লাসিয়া (CAH): এটি এমন একটি অবস্থা
যেখানে জেনেটিক কারণে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি অতিরিক্ত পুরুষ হরমোন তৈরি করে, ফলে
নারী শিশুর জননাঙ্গ দেখতে অনেকটা পুরুষের মতো হয়ে যায়।
৩.হিজড়া কি জিনদের সন্তান?" – কুসংস্কার বনাম বাস্তবতা
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত মিথ হলো, জিন বা অশুভ আত্মার প্রভাবে হিজড়া শিশুর জন্ম
হয়। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই দাবির কোনো ভিত্তি নেই।
কেন এই ধারণা প্রচলিত?
১. অজ্ঞানতা: প্রাচীনকালে মানুষ যখন ক্রোমোজোম বা জেনেটিক্স সম্পর্কে জানত না,
তখন যেকোনো অস্বাভাবিকতাকে অতিপ্রাকৃত শক্তির সাথে মিলিয়ে দিত।
২. সামাজিক ভীতি: ভিন্নতাকে গ্রহণ করার সক্ষমতা না থাকায় মানুষ একে "শাস্তি" বা
"জিনের আছর" বলে চালিয়ে দিত।
আরো পড়ুনঃ বজ্রপাত কেন হয় ইসলাম কি বলে
ইসলামিক এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ:
ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী, সন্তান দান করার মালিক একমাত্র আল্লাহ। হিজড়া বা 'খুনসা'
(Khunsa) ব্যক্তিদের অধিকার সম্পর্কে ইসলামে বিস্তারিত আলোচনা আছে। কুরআন বা
হাদিসের কোথাও বলা হয়নি যে তারা জিনদের সন্তান। বরং তারা আদম সন্তানেরই একটি অংশ
এবং সমাজের অন্য সবার মতো সম্মানের যোগ্য।
৪.গর্ভকালীন যেসব কারণে ঝুঁকি বাড়তে পারে
যদিও হিজড়া হওয়া মূলত জেনেটিক বা প্রাকৃতিকভাবে ঘটে, তবে কিছু বাহ্যিক প্রভাবক
ভ্রূণের লিঙ্গ বিকাশে সমস্যা তৈরি করতে পারে:
* চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন: গর্ভাবস্থায় হরমোনাল ওষুধ বা ভুল ঔষধ
সেবন করলে ভ্রূণের জননাঙ্গের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
* পরিবেশগত বিষক্রিয়া: অতিরিক্ত রেডিয়েশন বা ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে
আসা।
* নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে (Consanguineous Marriage): কাজিনদের মধ্যে
বিয়ের ফলে জেনেটিক ত্রুটিযুক্ত সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
৫.হিজড়া শিশুদের অধিকার ও আমাদের করণীয়
একটি হিজড়া শিশু জন্মালে পরিবারগুলো প্রায়ই লজ্জিত বোধ করে এবং শিশুকে ত্যাগ করে।
এটি একটি চরম অমানবিক কাজ।
* চিকিৎসা: জন্মের পরপরই যদি হরমোন থেরাপি বা প্রয়োজনীয় সার্জারি করা হয়,
তবে অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক জটিলতা দূর করা সম্ভব।
* শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা: তাদের সাধারণ স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ দিতে হবে।
* আইনি স্বীকৃতি: বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে হিজড়াদের 'তৃতীয় লিঙ্গ' হিসেবে
স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের ভোটাধিকার এবং চাকরির অধিকার রয়েছে।
উপসংহার
হিজড়া হওয়া কোনো রোগ নয়, বরং এটি প্রকৃতির একটি ভিন্নতা মাত্র। তারা জিন বা ভূতের
সন্তান নয়, বরং আপনার-আমার মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ। কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে আমাদের
উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের যোগ্য মর্যাদা দেওয়া।
মানুষের লিঙ্গ নির্ধারিত হয় ক্রোমোজোমের মাধ্যমে। সাধারণত মহিলাদের ক্রোমোজোম
বিন্যাস XX এবং পুরুষদের XY। ভ্রূণ গঠনের সময় যদি এই বিন্যাসে কোনো অসামঞ্জস্য
দেখা দেয়, তখনই ইন্টারসেক্স বা হিজড়া শিশুর জন্ম হয়।


এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url