গর্ভাবস্থায় কবুতরের মাংস খাওয়ার উপকারিতা
গর্ভাবস্থায় একজন মায়ের খাবারের তালিকায় পুষ্টিকর খাবারের উপস্থিতি থাকা
অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দেশে কবুতরের মাংস বেশ জনপ্রিয় এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর। অনেক
বিশেষজ্ঞ গর্ভাবস্থায় পরিমিত পরিমাণে কবুতরের মাংস খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
গর্ভাবস্থায় কবুতরের মাংস খাওয়ার উপকারিতা নিয়ে একটি বিস্তারিত আর্টিকেল নিচে
দেওয়া হলো:
পেজে সূচিপত্র:গর্ভাবস্থায় কবুতরের মাংস খাওয়ার উপকারিতা
- উচ্চমানের প্রোটিনের সহজলভ্য উৎস
- রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে আয়রনের ভূমিকা
- হজমশক্তি বৃদ্ধি ও বিপাকীয় উন্নতি
- শিশুর হাড় ও দাঁত গঠন
- হার্টের স্বাস্থ্য ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
- ক্লান্তি দূর ও শক্তির জোগান
- মস্তিষ্কের বিকাশ ও বুদ্ধিদীপ্ত শিশু
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা
- ত্বকের উজ্জ্বলতা ও গর্ভাবস্থার যত্ন
- সতর্কতা ও সঠিক খাওয়ার নিয়ম
১. উচ্চমানের প্রোটিনের সহজলভ্য উৎস
গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের সঠিক বিকাশের জন্য উচ্চমানের প্রোটিন অপরিহার্য যা কবুতরের
মাংসে খুব প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান থাকে। এই প্রোটিন গর্ভস্থ শিশুর মস্তিষ্কের
কোষ এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠনে সরাসরি অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখে। অন্যান্য লাল মাংসের তুলনায় কবুতরের মাংসের তন্তুগুলো বেশ নরম হয়
যা প্রোটিন শোষণে শরীরকে অনেক সাহায্য করে। গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় এবং তৃতীয়
ত্রৈমাসিকে যখন শিশুর দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে তখন এই মাংস প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে
পারে। এটি মায়ের জরায়ুর পেশিকে শক্তিশালী করে এবং স্তন্যদুগ্ধ উৎপাদনের
প্রস্তুতির জন্য শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। কবুতরের মাংসে
থাকা অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো শরীরের ক্ষয়পূরণ করতে এবং নতুন কোষ তৈরিতে অত্যন্ত
কার্যকর হিসেবে কাজ করে। প্রোটিনের অভাব হলে শিশুর ওজন কম হতে পারে তাই ডায়েটে
কবুতরের মাংস রাখা একটি বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে
উন্নত করে যা গর্ভাবস্থায় সংক্রমণ থেকে মা ও শিশুকে রক্ষা করতে পারে। কবুতরের
মাংস খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে যা গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের
ঝুঁকি কমাতে কিছুটা সাহায্য করে থাকে। সুস্বাদু হওয়ার পাশাপাশি এটি পুষ্টির একটি
নিরাপদ আধার হিসেবে বিশ্বজুড়ে অনেক পুষ্টিবিদদের কাছে সমাদৃত হয়ে আসছে। তাই সুষম
খাবারের তালিকায় কবুতরের মাংস যোগ করা মায়ের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এক অভাবনীয়
পরিবর্তন নিয়ে আসে।
২. রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে আয়রনের ভূমিকা
গর্ভাবস্থায় শরীরে রক্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় যার ফলে অনেক মা রক্তস্বল্পতা বা
অ্যানিমিয়া নামক সমস্যায় ভোগেন। কবুতরের মাংসে প্রচুর পরিমাণে হিম-আয়রন থাকে যা
মানবদেহে খুব দ্রুত এবং সহজেই শোষিত হতে সক্ষম হয় সব সময়। এই আয়রন রক্তে
হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বৃদ্ধি করে শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত
করতে বিশেষ সাহায্য করে। আয়রনের অভাবে গর্ভবতী মায়েরা প্রায়ই ক্লান্তি, মাথা
ঘোরা এবং শ্বাসকষ্টের মতো বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। নিয়মিত
কবুতরের মাংস খেলে এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং শরীরের প্রাণশক্তি
অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। এটি প্রসবকালীন জটিলতা কমাতে সাহায্য করে এবং প্রসবের পর
দ্রুত শরীর সুস্থ করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। শিশুর জন্মের সময় সঠিক ওজন
নিশ্চিত করতে এবং অপরিণত জন্মের ঝুঁকি কমাতে পর্যাপ্ত আয়রন গ্রহণ করা খুবই জরুরি।
কবুতরের মাংসের ঝোল বা স্যুপ নিয়মিত খেলে শরীরে রক্তের ঘাটতি পূরণ হয় এবং চেহারা
উজ্জ্বলতা ফিরে পায়। বাজারে পাওয়া আয়রন সাপ্লিমেন্টের চেয়ে প্রাকৃতিক উৎস থেকে
পুষ্টি গ্রহণ করা শরীরের জন্য সব সময় বেশি ভালো। কবুতরের মাংসে আয়রনের পাশাপাশি
কপার থাকে যা আয়রন শোষণের প্রক্রিয়াকে আরও বেশি গতিশীল এবং কার্যকর করে তোলে। তাই
রক্তস্বল্পতা দূর করতে গর্ভবতী মায়েদের খাদ্যতালিকায় কবুতরের মাংস রাখা একটি
অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত এবং কার্যকরী উপায়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট
পরিমাণে এই মাংস গ্রহণ করলে মা ও শিশু উভয়ই সুস্থ ও নিরাপদ থাকে।
৩. হজমশক্তি বৃদ্ধি ও বিপাকীয় উন্নতি
গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেক নারীর হজম প্রক্রিয়ায় ধীরগতি আসে
এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো অস্বস্তিকর সমস্যা দেখা দেয়। কবুতরের মাংস অন্যান্য ভারী
মাংসের তুলনায় অত্যন্ত হালকা এবং এটি হজম করা শরীরের জন্য অনেক বেশি সহজ হয়। এর
মাংসের তন্তুগুলো খুব ক্ষুদ্র এবং নরম হওয়ায় পাকস্থলী এটি খুব দ্রুত ভেঙে
পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করতে পারে। যারা গর্ভাবস্থায় গ্যাস্ট্রিক বা বদহজমের
সমস্যায় ভোগেন তাদের জন্য কবুতরের মাংস একটি চমৎকার বিকল্প খাদ্য হতে পারে। এটি
বিপাকীয় হার বৃদ্ধি করে শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে এবং হজম সংক্রান্ত
অস্বস্তি থেকে মুক্তি দেয়। কবুতরের মাংসে চর্বির পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকে যা
পাকস্থলীর ওপর বাড়তি কোনো চাপ সৃষ্টি করে না কখনোই। এটি খেলে পেট ভার হয়ে থাকার
অনুভূতি হয় না বরং শরীরে এক ধরনের হালকা ভাব বজায় থাকে। পরিপাকতন্ত্রের
কার্যকারিতা উন্নত করার পাশাপাশি এটি অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম
নিঃসরণেও বিশেষ সাহায্য করে থাকে। গর্ভাবস্থায় খাবারে অরুচি দেখা দিলে কবুতরের
মাংসের পাতলা ঝোল রুচি ফিরিয়ে আনতে জাদুর মতো কাজ করতে পারে। কবুতরের মাংসের
পুষ্টিগুণ সহজে রক্তে মিশে যায় যা ভ্রূণের পুষ্টির জোগান দিতে এক মুহূর্ত সময়
নষ্ট করে না। সঠিক হজম প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার মাধ্যমে এটি মায়ের মানসিক
প্রশান্তি বজায় রাখতেও পরোক্ষভাবে ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই সুস্থ গর্ভাবস্থার
জন্য কবুতরের মাংস নিয়মিত তালিকায় রাখা হজমশক্তির উন্নতির জন্য একটি অত্যন্ত
বিচক্ষণ কাজ।
৪. শিশুর হাড় ও দাঁত গঠন
গর্ভস্থ শিশুর হাড় এবং দাঁতের মজবুত কাঠামোর জন্য ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের
প্রয়োজনীয়তা বলে শেষ করা সম্ভব নয়। কবুতরের মাংসে এই দুটি খনিজ উপাদান পর্যাপ্ত
পরিমাণে থাকে যা শিশুর কঙ্কাল তন্ত্রের সঠিক বিকাশে সহায়তা করে। গর্ভাবস্থায় মা
যদি পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম না পান তবে শিশু মায়ের হাড় থেকে ক্যালসিয়াম শোষণ করে
নেয়। এর ফলে মা পরবর্তী জীবনে হাড়ের ক্ষয়রোগ বা অস্টিওপোরোসিসের মতো গুরুতর
সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। কবুতরের মাংস খেলে এই খনিজ উপাদানের
ঘাটতি পূরণ হয় এবং মায়ের হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি বজায় থাকে। এটি শিশুর দাঁতের এনামেল
গঠন এবং হাড়ের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধিতে গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই কার্যকরী ভূমিকা পালন করে
থাকে। ফসফরাস শরীরের কোষের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং ডিএনএ ও আরএনএ গঠনে অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে। কবুতরের মাংসে থাকা ম্যাগনেসিয়ামও হাড়ের
স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী যা ক্যালসিয়াম শোষণে শরীরে বিশেষ সহায়তা প্রদান করে
থাকে। হাড় মজবুত হওয়ার পাশাপাশি এটি শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশেও পরোক্ষভাবে
ইতিবাচক প্রভাব ফেলে যা দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ফলদায়ক। গর্ভাবস্থায় পিঠ ও কোমরের
ব্যথা কমাতে মজবুত হাড়ের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য যা কবুতরের মাংস নিশ্চিত করতে
সাহায্য করে। এই মাংসের নিয়মিত ব্যবহার শিশুর শারীরিক গঠনকে শক্তিশালী করে এবং
জন্মগত হাড়ের ত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। তাই একটি সুস্থ ও বলিষ্ঠ শিশুর
জন্মের প্রত্যাশায় গর্ভবতী মায়েদের খাদ্যতালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত করা একান্ত
প্রয়োজন।
৫. হার্টের স্বাস্থ্য ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
গর্ভাবস্থায় রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত জরুরি কারণ উচ্চ রক্তচাপ মা ও শিশু
উভয়ের জন্যই বিপদের কারণ হতে পারে।
কবুতরের মাংসে কোলেস্টেরলের পরিমাণ খুবই কম এবং এটি অসম্পৃক্ত চর্বি সমৃদ্ধ যা
হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ভালো। এই মাংসে থাকা পটাশিয়াম রক্তনালিগুলোকে
শিথিল রাখতে সাহায্য করে এবং রক্তচাপের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে। সোডিয়ামের পরিমাণ কম থাকায় এটি শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে যাওয়া বা
হাত-পা ফুলে যাওয়ার সমস্যা প্রতিরোধ করতে পারে। গর্ভাবস্থায় হৃদপিণ্ডকে অতিরিক্ত
কাজ করতে হয় তাই হৃদযন্ত্রের পেশিকে শক্তিশালী করতে কবুতরের মাংসের পুষ্টি
অত্যন্ত কার্যকর। এটি রক্ত চলাচলের প্রক্রিয়াকে উন্নত করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি
কমাতে শরীরের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করে। নিয়মিত কবুতরের মাংস
খেলে ধমনীতে চর্বি জমার ভয় থাকে না যা গর্ভাবস্থায় হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমিয়ে
দেয়। এতে থাকা ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স হার্টের কার্যকারিতা বজায় রাখতে এবং মানসিক
চাপ কমাতে বিশেষ সহায়তা প্রদান করে থাকে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে
প্রি-একলাম্পসিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে যা এই মাংস খাওয়ার মাধ্যমে
নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কবুতরের মাংসের ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তে ভালো
কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে এবং খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। যারা
গর্ভাবস্থায় স্থূলতা বা হার্টের সমস্যায় চিন্তিত তারা নিরাপদে কবুতরের মাংস নিজের
ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। সুস্থ হার্ট মানেই সুস্থ মা এবং নিরাপদ শিশু যা
কবুতরের মাংসের পরিমিত গ্রহণে নিশ্চিত করা অনেক সহজ হয়।
আরো পড়ুন:ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি
৬. ক্লান্তি দূর ও শক্তির জোগান
গর্ভাবস্থায় মায়েদের শরীর প্রায়ই দুর্বল বোধ করে এবং সামান্য আঘাতেই দ্রুত
হাঁপিয়ে ওঠার প্রবণতা দেখা দিয়ে থাকে। কবুতরের মাংস ভিটামিন বি১, বি২ এবং বি৬ এর
একটি শক্তিশালী উৎস যা খাদ্যকে সরাসরি শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে। এই মাংসের
নির্যাস শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তির জোগান দেয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার মানসিক
শক্তি জোগায়। এটি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে যার ফলে গর্ভবতী মায়েরা
মানসিক অবসাদ এবং শারীরিক অলসতা থেকে মুক্তি পান। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে যে বমি
বমি ভাব এবং দুর্বলতা থাকে তা কাটাতে কবুতরের মাংসের স্যুপ অনেক উপকারী। এতে থাকা
গ্লাইকোজেন পেশির শক্তি বৃদ্ধি করে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বজায় রাখতে
বিশেষ সহায়তা প্রদান করে। নিয়মিত কবুতরের মাংস খেলে ঘুমের মান উন্নত হয় যা
গর্ভবতী নারীর শরীর পুনর্গঠনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। এটি শরীরে
হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে যার ফলে মুড সুইং বা অকারণে মেজাজ খারাপ হওয়ার সমস্যা
কমে। কবুতরের মাংসের পুষ্টি উপাদানগুলো রক্তের শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে ফলে
হঠাৎ করে শক্তি কমে যাওয়ার ভয় থাকে না। যারা গর্ভাবস্থায় চাকরি বা ঘরের ভারী কাজ
করেন তাদের জন্য এই মাংস একটি প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংক হিসেবে কাজ করে। শরীরের
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি এটি ক্লান্তিজনিত মাথাব্যথা দূর করতেও অনেক
সময় কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তাই প্রতিদিনের কর্মচাঞ্চল্য ধরে রাখতে এবং
প্রফুল্ল থাকতে কবুতরের মাংসের ওপর আস্থা রাখা যেতে পারে নিঃসন্দেহে।
৭. মস্তিষ্কের বিকাশ ও বুদ্ধিদীপ্ত শিশু
গর্ভস্থ শিশুর মস্তিষ্কের সঠিক গঠন এবং মেধা বিকাশের জন্য কোলিন এবং অন্যান্য
প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড অপরিহার্য উপাদান। কবুতরের মাংসে এমন কিছু উপাদান থাকে
যা নিউরনের সংযোগ বৃদ্ধি করতে এবং স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে বিশেষ সহায়তা করে। এই
মাংসের ভিটামিন বি-১২ শিশুর স্নায়বিক ত্রুটি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করে যা প্রতিটি মায়ের জন্য কাম্য। নিয়মিত এই মাংস খেলে শিশুর শ্রবণশক্তি এবং
দৃষ্টিশক্তির বিকাশ ত্বরান্বিত হয় যা জন্মের পর স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়ে থাকে। এতে
থাকা জিংক মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে এবং শিশুর জন্মগত মেধা বিকাশে
প্রাকৃতিক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। কবুতরের মাংসের পুষ্টিগুণ মায়ের রক্ত থেকে
প্লাসেন্টার মাধ্যমে সরাসরি শিশুর মস্তিষ্কে পৌঁছে তার গঠন মজবুত করে তোলে।
গর্ভাবস্থায় মায়ের ডায়েটে এই মাংস থাকলে শিশুর মধ্যে শেখার ক্ষমতা এবং একাগ্রতা
বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এটি স্নায়বিক উত্তেজনা প্রশমিত করে শিশুকে
শান্ত রাখতে সাহায্য করে যা তার সুস্থ বিকাশের জন্য অত্যন্ত ফলদায়ক। মস্তিষ্কের
কোষগুলোর সুরক্ষায় কবুতরের মাংসের অ্যান্টি-অক্সিডেন্টগুলো ঢাল হিসেবে কাজ করে
এবং কোষের ক্ষতি প্রতিরোধ করে। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পাশাপাশি এটি শিশুর আচরণগত
উন্নতিতেও পরোক্ষভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন। কবুতরের
মাংস খাওয়ার ফলে মা ও শিশুর মধ্যে স্নায়বিক সুস্থতা বজায় থাকে যা একটি সুন্দর
ভবিষ্যতের ভিত্তি। তাই আগামীর উজ্জ্বল মেধা নিশ্চিত করতে গর্ভাবস্থায় এই পুষ্টিকর
খাবারটি গ্রহণ করা অত্যন্ত দূরদর্শী একটি পদক্ষেপ।
৮. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা
গর্ভাবস্থায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা কমে যায় যার ফলে খুব সহজেই সর্দি,
কাশি বা অন্যান্য সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কবুতরের মাংসে প্রচুর পরিমাণে জিংক
এবং সেলেনিয়াম থাকে যা শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে
তোলে। এই খনিজগুলো শ্বেত রক্তকণিকার উৎপাদন বৃদ্ধি করে যা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া
এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শরীরকে সাহায্য করে। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ
হওয়ায় এটি শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায় এবং কোষগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি থেকে
রক্ষা করতে পারে। কবুতরের মাংস নিয়মিত খেলে শরীরে কোনো প্রদাহ থাকলে তা দ্রুত
সেরে যায় এবং দ্রুত আরোগ্য লাভে সহায়তা করে। এটি লিভারের কার্যকারিতা উন্নত করে
শরীর থেকে বিষাক্ত টক্সিন বের করে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। সুস্থ লিভার
মানেই পরিষ্কার রক্ত যা গর্ভস্থ শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ভালো পরিবেশ তৈরি
করতে সক্ষম। ঋতু পরিবর্তনের সময় হওয়া জ্বর বা ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে গর্ভবতী মাকে
সুরক্ষা দিতে কবুতরের মাংসের কোনো বিকল্প নেই। এতে থাকা প্রাকৃতিক
অ্যান্টিবডিগুলো শিশুর শরীরেও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করতে
পরোক্ষভাবে সাহায্য করে থাকে। গর্ভাবস্থায় যেকোনো সংক্রমণ ভ্রূণের জন্য
ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে তাই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো সব সময় জরুরি। কবুতরের
মাংসের পুষ্টি সরাসরি ইমিউন সিস্টেমকে রিচার্জ করে যার ফলে মা সারাক্ষণ সজীব ও
সুস্থ থাকতে পারেন। প্রাকৃতিক উপায়ে সুস্থ থাকতে এবং মেডিসিনের ওপর নির্ভরতা
কমাতে কবুতরের মাংস একটি অত্যন্ত কার্যকরী খাদ্য উপাদান।
৯. ত্বকের উজ্জ্বলতা ও গর্ভাবস্থার যত্ন
গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে ত্বকে মেছতা, ব্রণের সমস্যা বা কালচে দাগ
দেখা দেওয়া একটি সাধারণ ঘটনা।
কবুতরের মাংসে থাকা ভিটামিন বি কমপ্লেক্স এবং খনিজ উপাদানগুলো ত্বকের
স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে ও উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করে। এটি ত্বকের কোলাজেন
উৎপাদন বৃদ্ধি করে যার ফলে গর্ভাবস্থার স্ট্রেচ মার্ক বা ফাটা দাগ অনেকাংশে কম
হতে পারে। নিয়মিত এই মাংস খেলে ত্বকের কোষগুলো সজীব থাকে এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়ার
কারণে চেহারায় একটি স্বাভাবিক লাবণ্য ফুটে ওঠে। শুধু ত্বক নয় বরং গর্ভাবস্থায় নখ
এবং চুলের ভঙ্গুরতা রোধ করতেও কবুতরের মাংসের পুষ্টি অনেক ভূমিকা রাখে। এতে থাকা
সেলেনিয়াম ত্বককে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয় এবং ত্বকের
বার্ধক্যজনিত ছাপ পড়া প্রতিরোধ করে। কবুতরের মাংসের প্রোটিন টিস্যু মেরামতে
সাহায্য করে ফলে ত্বকের কোনো ক্ষত থাকলে তা খুব দ্রুত শুকিয়ে যায়। অনেক গর্ভবতী
নারীর ত্বক গর্ভাবস্থায় শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যায় যা এই মাংস নিয়মিত খেলে দূর করা
সম্ভব। এটি শরীরের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং ত্বককে ভেতর থেকে পরিষ্কার
ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল করে গড়ে তুলতে পারে। চেহারার ক্লান্তিভাব দূর করে সতেজতা
ফিরিয়ে আনতে কবুতরের মাংসের পুষ্টিগুণ কসমেটিকসের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে।
প্রসবের পরেও দ্রুত ত্বকের গঠন ফিরিয়ে আনতে এবং চুল পড়া কমাতে এই মাংস
গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। তাই নিজেকে সুন্দর রাখতে এবং গর্ভাবস্থার
শারীরিক পরিবর্তনগুলো আত্মবিশ্বাসের সাথে মোকাবিলা করতে এটি খাওয়া উচিত।
১০. সতর্কতা ও সঠিক খাওয়ার নিয়ম
যদিও কবুতরের মাংস অত্যন্ত উপকারী তবুও গর্ভাবস্থায় এটি খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু
বিশেষ নিয়ম ও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কবুতরের মাংস সব সময় খুব ভালো করে
ধুয়ে এবং উচ্চ তাপমাত্রায় সেদ্ধ করে রান্না করা উচিত যাতে জীবাণু ধ্বংস হয়।
আধসেদ্ধ মাংস বা কাঁচা ভাব থাকলে তাতে সালমোনেলা বা অন্যান্য ক্ষতিকারক
ব্যাকটেরিয়া থাকার ঝুঁকি থেকে যায় যা বিপদজনক। রাস্তার ধারের অস্বাস্থ্যকর
পরিবেশের বদলে বাড়িতে পরিষ্কারভাবে রান্না করা কবুতরের মাংসই গর্ভবতী মায়েদের
জন্য সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। অতিরিক্ত ঝাল বা মসলা দিয়ে রান্না না করে অল্প মসলায়
পাতলা ঝোল বা স্টু হিসেবে খাওয়া বেশি উপকারী। আপনার যদি কবুতরের মাংসে আগে থেকেই
কোনো অ্যালার্জি থাকে তবে তা এড়িয়ে চলাই হবে আপনার জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। সপ্তাহে
এক বা দুই দিনের বেশি কবুতরের মাংস না খেয়ে বৈচিত্র্যময় সুষম খাবার তালিকায় রাখার
পরামর্শ দেওয়া হয়। গর্ভাবস্থায় কোনো বড় শারীরিক জটিলতা থাকলে নতুন কোনো খাবার যোগ
করার আগে অবশ্যই আপনার গাইনি ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। মাংসটি টাটকা কি না এবং
কবুতরটি সুস্থ ছিল কি না তা নিশ্চিত হয়ে কেনা বা সংগ্রহ করা উচিত। ফ্রিজে রাখা
মাংসের চেয়ে টাটকা রান্না করা মাংসের পুষ্টিগুণ অনেক বেশি থাকে যা ভ্রূণের বিকাশে
ভালো কাজ করে। মনে রাখবেন যেকোনো খাবারই অতিরিক্ত খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়
তাই পরিমিতি বোধ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক নিয়ম মেনে এবং আনন্দ নিয়ে খাবার
গ্রহণ করলে কবুতরের মাংস আপনার গর্ভাবস্থাকে আরও বেশি আনন্দময় করতে পারে। মা ও
শিশুর সার্বিক কল্যাণে সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য এবং সুস্থ
আগামীর অঙ্গীকার।



এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url