কোন মাটি ধান চাষের অনুপযোগী
ধান আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য হলেও সব ধরনের মাটিতে এটি সমানভাবে জন্মায় না। ধান
চাষের জন্য মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট পিএইচ (pH) মান থাকা
জরুরি। কিছু মাটি এমন রয়েছে যা ধান চাষের জন্য একদমই উপযোগী নয়।
ধান চাষের অনুপযোগী মাটি নিয়ে নিচে একটি বিস্তারিত নিবন্ধ দেওয়া হলো:
পেজ সূচিপত্র:কোন মাটি ধান চাষের অনুপযোগী
- অনুপযোগী মাটির প্রাথমিক ধারণা
- অতিরিক্ত বালুময় বা বেলে মাটি
- লবণাক্ত মাটির ক্ষতিকর প্রভাব
- উচ্চ অম্লীয় বা অ্যাসিডিক মাটি
- ক্ষারীয় মাটির নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য
- পাথুরে বা কাঁকরযুক্ত ভূমির সমস্যা
- জৈব পদার্থের অভাবজনিত মাটি
- জলাবদ্ধ ও বিষাক্ত খনিজযুক্ত মাটি
- পাহাড়ি ঢাল ও ক্ষয়প্রাপ্ত মাটি
- উপসংহার ও ভবিষ্যৎ নির্দেশনা
১. অনুপযোগী মাটির প্রাথমিক ধারণা
ধান চাষের সাফল্যের প্রধান ভিত্তি হলো মাটির গঠন এবং এর পানি ধারণ করার বিশেষ
ক্ষমতা।
সব ধরণের মাটিতে ধান চাষ করা সম্ভব নয় কারণ ধানের শিকড় অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে
থাকে।
একটি নির্দিষ্ট মাত্রার আর্দ্রতা এবং পুষ্টি উপাদান না থাকলে ধানের ফলন
মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
সাধারণত যেসব মাটিতে পানি জমে থাকে না বা পুষ্টির অভাব থাকে সেগুলো চাষের
অনুপযোগী হিসেবে গণ্য।
কৃষকদের প্রথমে মাটির রাসায়নিক ও ভৌত গঠন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা অত্যন্ত
জরুরি একটি বিষয়।
ভুল মাটিতে চাষাবাদ করলে শ্রম ও অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই লাভ করা সম্ভব হয় না।
মাটির গুণমান যাচাই না করে বীজ বপন করলে অঙ্কুরোদগম প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে
শুরু করে খুব দ্রুত।
ধানের জন্য বিশেষ পিএইচ মান প্রয়োজন যা অনেক মাটিতে প্রাকৃতিকভাবেই বিদ্যমান থাকে
না কোনোভাবে।
তাই অনুপযোগী মাটি শনাক্ত করা ধান চাষের প্রাথমিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
হিসেবে বিবেচিত হয়।বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মাটির পরীক্ষা করলে সহজেই চাষের অযোগ্য
জমিগুলো আলাদা করা সম্ভব হয়ে ওঠে সবার।
উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার অভাবে অনুপযোগী মাটিতে ধানের চারাগুলো হলদে হয়ে মারা যেতে
পারে খুব সহজেই।
পরিশেষে বলা যায় যে সুস্থ সবল ফসলের জন্য মাটির সঠিক নির্বাচনই হলো মূল চাবিকাঠি।
২. অতিরিক্ত বালুময় বা বেলে মাটি
বেলে মাটি মূলত ধান চাষের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে অনেক ক্ষেত্রে।
এই মাটির কণাগুলো অনেক বড় হওয়ায় এদের মধ্যে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা একদমই থাকে না।
ধান চাষে প্রচুর পরিমাণ স্থির পানির প্রয়োজন হয় যা বেলে মাটিতে ধরে রাখা অসম্ভব
ব্যাপার।
বালুময় মাটিতে সার প্রয়োগ করলে তা বৃষ্টির পানি বা সেচের সাথে মাটির নিচে চলে
যায়।
গাছ তার প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করার আগেই মাটি থেকে সেগুলো ধুয়ে মুছে সাফ
হয়ে যায়।
বেলে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য থাকে যা ধানের বৃদ্ধিকে
মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
মাটির কণাগুলোর আলগা গঠনের কারণে ধানের শিকড় মাটির সাথে শক্তভাবে আটকে থাকতে পারে
না।
তীব্র রোদে বেলে মাটি খুব দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে যায় যা কচি চারার জন্য মৃত্যুর কারণ
হতে পারে।
সেচ খরচ এই মাটিতে অনেক বেশি হয় যা সাধারণ কৃষকদের জন্য বহন করা প্রায় অসম্ভব।
যান্ত্রিক চাষাবাদের ক্ষেত্রেও বেলে মাটি খুব একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে না
আমাদের দেশে।
বেলে মাটিতে উৎপাদিত ধানের গুণগত মান এবং ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়ে
থাকে সর্বদা।
তাই ধান চাষের পরিকল্পনা করার সময় অতি বালুময় জমি এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমত্তার কাজ
হবে সবার।
৩. লবণাক্ত মাটির ক্ষতিকর প্রভাব
উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত মাটি ধান চাষের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ
করে থাকে।
মাটিতে লবণের আধিক্য থাকলে গাছ মাটি থেকে স্বাভাবিকভাবে পানি শোষণ করতে ব্যর্থ হয়
পুরোপুরি।
অসমোসিস প্রক্রিয়ায় বাধার সৃষ্টি হয় ফলে চারা গাছগুলো তৃষ্ণার্ত থেকেই ধীরে ধীরে
শুকিয়ে যেতে থাকে।
লবণাক্ততা মাটির উপকারী অণুজীবদের ধ্বংস করে দেয় যা পরোক্ষভাবে ধানের বৃদ্ধি
কমিয়ে দেয় অনেক।
এই মাটিতে বিষাক্ত সোডিয়াম আয়নের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় গাছের কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া
থমকে যায়।
লবণাক্ত মাটিতে ধানের পাতাগুলো তামাটে রঙ ধারণ করে এবং প্রান্ত থেকে পুড়ে যাওয়ার
মতো দেখায়।
ধানের ছড়া আসার সময় লবণাক্ততার প্রভাব বাড়লে দানা গঠন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে
ব্যাহত হয়ে পড়ে।
যদিও কিছু লবণসহিষ্ণু জাত আবিষ্কৃত হয়েছে তবে সাধারণ ধান এখানে চাষ করা একদমই
সম্ভব নয়।
লবণাক্ততা দূর করার জন্য প্রচুর মিঠা পানির প্রয়োজন যা অনেক সময় পাওয়া দুষ্কর হয়ে
ওঠে।
দীর্ঘমেয়াদী লবণাক্ততা মাটির গঠনকে নষ্ট করে দেয় এবং জমিকে চিরস্থায়ীভাবে অনুর্বর
করে তোলে ক্রমে।
উপকূলীয় চাষিদের জন্য এটি একটি প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জ যা কাটিয়ে ওঠা বেশ
ব্যয়সাপেক্ষ ও কঠিন কাজ।
সঠিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকলে লবণাক্ত মাটিতে ধান চাষ করা একটি বড় ঝুঁকি হতে
পারে।
৪. উচ্চ অম্লীয় বা অ্যাসিডিক মাটি
মাটির পিএইচ (pH) মান যদি ৩.৫ এর নিচে নেমে যায় তবে তাকে উচ্চ অম্লীয় মাটি বলে।
অ্যাসিডিক মাটিতে অ্যালুমিনিয়াম এবং ম্যাঙ্গানিজের বিষাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় ধানের
শিকড় নষ্ট হয়ে যায় দ্রুত।
এই ধরণের মাটিতে ফসফরাস এবং ক্যালসিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো গাছের
জন্য সহজলভ্য থাকে না।
অ্যাসিডিক কন্ডিশনে মাটির গঠন শক্ত হয়ে যায় ফলে বায়ু চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় শিকড়ের
গভীরে।
ধানের চারাগুলো এই মাটিতে খাটো ও রুগ্ন হয়ে যায় এবং পাতার রঙ বিবর্ণ দেখায় সবসময়।
অম্লীয় মাটিতে উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো বাঁচতে পারে না ফলে নাইট্রোজেন চক্র
বাধাগ্রস্ত হয় মাটির ভেতরে।
চুন প্রয়োগের মাধ্যমে অম্লতা কমানো গেলেও তা অনেক সময় ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদী
প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়।
পাহাড়ি এলাকার লাল মাটি বা পিট মাটিতে সাধারণত এই ধরণের অম্লতা বেশি দেখা দিয়ে
থাকে।
ধানের স্বাভাবিক বিপাকীয় কাজ ব্যাহত হওয়ার কারণে গাছে পর্যাপ্ত ছড়া বা দানা আসে
না।
অ্যাসিডিক মাটি ধান চাষের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে যা ফলন বিপর্যয়ের অন্যতম
প্রধান কারণ।
মাটির সঠিক অম্লতা বজায় না রাখলে সুষম সার ব্যবহার করলেও কোনো আশানুরূপ ফল পাওয়া
যায় না।
তাই ধান চাষের আগে মাটির পিএইচ পরীক্ষা করা অপরিহার্য একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
হিসেবে গণ্য।
৫. ক্ষারীয় মাটির নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য
ক্ষারীয় বা অ্যালকালাইন মাটি ধানের চারা বৃদ্ধির জন্য একটি প্রতিকূল পরিবেশ
তৈরি করে থাকে।
এই মাটির পিএইচ মান ৮.৫ এর উপরে থাকে যা ধানের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর একটি
অবস্থা।
ক্ষারীয় মাটিতে দস্তা বা জিঙ্কের অভাব প্রকটভাবে দেখা দেয় যা ধানের খৈরা রোগের
কারণ।
আয়রন বা লোহার অভাবে গাছের নতুন পাতাগুলো সাদা হয়ে যায় এবং গাছ বৃদ্ধি পায় না।
এই মাটিতে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের আধিক্য থাকে যা মাটির ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দেয়
খুব সহজে।
পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে ক্ষারীয় মাটিতে সোডিয়ামের বিষক্রিয়া
দেখা দিতে পারে দ্রুত।
মাটির গঠন শক্ত এবং আঠালো হয়ে যায় ফলে চারা রোপণ করা কৃষকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্ষারীয় মাটিতে সারের কার্যকারিতা কমে যায় কারণ রাসায়নিক বিক্রিয়া ধানের
প্রতিকূলে চলে যায় সবসময়।
গাছের মূলগুলো প্রয়োজনীয় অণুপুষ্টি সংগ্রহ করতে পারে না এই উচ্চ পিএইচ যুক্ত
পরিবেশ থেকে।
শুষ্ক মৌসুমে এই মাটি ফেটে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি করে যা চাষাবাদের জন্য
ক্ষতিকর।
জিবসাম বা সালফার ব্যবহার করে এই মাটি শোধনের চেষ্টা করা হয় তবে তা সময়সাপেক্ষ
কাজ।
ধানের সুস্থ বিকাশের জন্য ক্ষারীয় মাটি কখনোই প্রথম পছন্দ হতে পারে না আদর্শ
কৃষিতে।
৬. পাথুরে বা কাঁকরযুক্ত ভূমির সমস্যা
পাথুরে বা কাঁকরযুক্ত জমি ধান চাষের জন্য যান্ত্রিক ও ভৌত উভয় দিক থেকেই
অনুপযোগী।
মাটিতে পাথরের পরিমাণ বেশি থাকলে লাঙল বা ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করা অসম্ভব হয়ে
পড়ে।
পাথুরে মাটিতে মাটি ও পানির যে সুষম অনুপাত থাকা প্রয়োজন তা বজায় থাকে না কখনোই।
ধানের সূক্ষ্ম শিকড়গুলো পাথরের স্তরের কারণে গভীরে প্রবেশ করতে পারে না এবং
পুষ্টি হারায়।
এই ধরণের মাটিতে পানির স্তর অনেক নিচে থাকে এবং উপরিভাগ দ্রুত শুকিয়ে কাঠ হয়ে
যায়।
পাথরের উপস্থিতির কারণে মাটির তাপমাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হয় যা ধানের জন্য
ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
পাহাড়ের পাদদেশে বা নদীর তীরে এই ধরণের পাথুরে জমির আধিক্য বেশি দেখা দিয়ে থাকে
সাধারণত।
সার প্রয়োগ করলেও তা পাথরের ফাঁক দিয়ে ভূগর্ভে চলে যায় ফলে গাছের কোনো উপকারে আসে
না।
চাষের জমিতে পাথর থাকলে তা ফসলের নিড়ানি এবং পরিচর্যার কাজে বড় ধরণের
প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
পাথুরে মাটিতে ধানের ফলন এতই কম হয় যে তা চাষের উৎপাদন খরচও তুলতে পারে না।
মাটি থেকে পাথর অপসারণ করা একটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এবং ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া যা
লাভজনক নয় একদম।
তাই বাণিজ্যিক ধান চাষের জন্য পাথুরে বা কাঁকরযুক্ত ভূমি সবসময় বর্জন করা উচিত
কৃষকদের।
৭. জৈব পদার্থের অভাবজনিত মাটি
যে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে থাকে তা ধান চাষের জন্য অনুপযোগী।
জৈব পদার্থ হলো মাটির প্রাণ যা মাটির কণাগুলোকে একত্রে ধরে রাখতে এবং পানি ধরে
রাখতে সাহায্য করে।
জৈব পদার্থের অভাবে মাটি তার স্বাভাবিক উর্বরতা হারিয়ে ফেলে এবং মরুভূমির মতো
আচরণ করতে থাকে।
এই মাটিতে উপকারী অণুজীবের সংখ্যা কমে যায় ফলে মাটির স্বাস্থ্য দ্রুত খারাপ হতে
শুরু করে।
রাসায়নিক সার প্রয়োগ করলেও জৈব পদার্থের অনুপস্থিতিতে মাটি তা গ্রহণ করতে সক্ষম
হয় না ঠিকঠাক।
জৈব পদার্থহীন মাটি খুব দ্রুত শক্ত হয়ে যায় এবং বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়
শিকড়ে।
ধানের চারাগুলো পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে ফ্যাকাসে হয়ে যায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
হারিয়ে ফেলে।
গাছের বৃদ্ধি থমকে যায় এবং অল্প আঘাতেই গাছগুলো মরে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা
যায় অনেক।
এই ধরণের মাটি থেকে ভালো ফলন আশা করা বৃথা কারণ এটি ধানকে প্রয়োজনীয় খাদ্য দিতে
পারে না।
কম্পোস্ট বা গোবর সার ব্যবহার করে দীর্ঘ মেয়াদে এই মাটির উন্নতি করা সম্ভব হলেও
তা সময়সাপেক্ষ।
মাটির সঠিক স্বাস্থ্য রক্ষা না করলে ধানের গুণগত মান কোনোভাবেই বজায় রাখা সম্ভব
হয় না।
তাই জৈব পদার্থহীন মাটি চাষের আওতায় আনার আগে মাটির প্রাণ ফিরিয়ে আনা একান্ত
আবশ্যক।
৮. জলাব্ধ ও বিষাক্ত খনিজযুক্ত মাটি
অতিরিক্ত জলাবদ্ধতা এবং বিষাক্ত খনিজের উপস্থিতি মাটিকে ধান চাষের অযোগ্য করে
তোলে খুব দ্রুত।
যদিও ধান পানিতে ভালো জন্মে তবে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বিহীন পচা পানির জলাবদ্ধতা
ধানের শত্রু।
স্থির এবং পচা পানিতে অক্সিজেনের অভাব ঘটে যা ধানের শিকড়কে পচিয়ে ফেলতে সাহায্য
করে দ্রুত।
মাটিতে যদি আর্সেনিক বা সীসার মতো ভারী ধাতুর পরিমাণ বেশি থাকে তবে তা চাষের
অনুপযোগী।
এই বিষাক্ত ধাতুগুলো চালের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে মারাত্মক
স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে থাকে।
শিল্পাঞ্চলের পার্শ্ববর্তী জমিতে কেমিক্যাল বর্জ্য মিশে মাটি ধান চাষের অযোগ্য
হয়ে পড়ে চিরদিনের জন্য।
বিষাক্ত মাটিতে উৎপাদিত ধানের চারা বিকৃত হয়ে যায় এবং দানাগুলো অপুষ্ট থেকে যায়
সবসময়।
অতিরিক্ত লোহা বা আয়রন যুক্ত মাটিতে ধান গাছের পাতা লালচে হয়ে পুড়ে যাওয়ার লক্ষণ
দেখা দেয়।
মাটির নিচের স্তরে শক্ত কাদা বা পাথুরে স্তর থাকলে পানি চলাচল ব্যাহত হয় এবং
গ্যাস জমে।
এই গ্যাস ধানের শিকড়ের জন্য বিষাক্ত এবং এটি গাছের স্বাভাবিক শ্বাসক্রিয়া বন্ধ
করে দেয় মুহূর্তেই।
নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত না করলে এই ধরণের নিচু জমিতে ধান চাষ করা লোকসানের কারণ
হয়।
পরিবেশ দূষণ রোধ এবং মাটির বিষক্রিয়া পরীক্ষা করা নিরাপদ ধান উৎপাদনের জন্য
অত্যন্ত জরুরি কাজ।
৯. পাহাড়ি ঢাল ও ক্ষয়প্রাপ্ত মাটি
তীব্র ঢালু পাহাড়ের মাটি এবং উপরের স্তর ধুয়ে যাওয়া মাটি ধান চাষের জন্য উপযুক্ত
নয়।
পাহাড়ি ঢালে বৃষ্টির পানির সাথে মাটির উপরের উর্বর অংশ ধুয়ে নিচে চলে যায় খুব
সহজে।
মাটির উপরের স্তরেই সব পুষ্টি উপাদান থাকে যা হারিয়ে গেলে মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ে
একদম।
ঢালু জমিতে পানি ধরে রাখা সম্ভব হয় না যা ধানের জন্য সবচেয়ে বড় একটি নেতিবাচক
দিক।
ক্ষয়প্রাপ্ত মাটিতে ধানের শিকড় শক্ত কোনো ভিত্তি পায় না ফলে গাছ সহজেই উপড়ে পড়ে
যায়।
এই মাটিতে বালির ভাগ বেশি থাকে এবং প্রয়োজনীয় পলিমাটির অভাব প্রকটভাবে বিদ্যমান
থাকে সবসময়।
পাহাড়ি এলাকায় জুম চাষের ফলে মাটির গঠন নষ্ট হয়ে যায় এবং তা ধান চাষের অনুপযোগী
হয়।
মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার কোনো ক্ষমতা না থাকায় সামান্য খরাতেই ফসল পুড়ে ছাই হয়ে
যায়।
এই ধরণের জমিতে চাষাবাদ করলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে
যায় অনেক।
ক্ষয়প্রাপ্ত মাটিতে সারের কার্যকারিতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে কারণ পুষ্টি ধুয়ে
চলে যায় নিচে।
উন্নত ধাপ চাষ পদ্ধতি ব্যবহার না করলে পাহাড়ি ঢালে ধান উৎপাদন করা একটি পণ্ডশ্রম
মাত্র।
মাটির উপরিভাগ রক্ষা করা এবং ভূমিক্ষয় রোধ করাই হলো এই সমস্যার একমাত্র টেকসই
সমাধান।
১০. উপসংহার ও ভবিষ্যৎ নির্দেশনা
ধান চাষের অনুপযোগী মাটি শনাক্ত করা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি অন্যতম
প্রধান শর্ত।
ভৌগোলিক ও রাসায়নিক কারণে বিভিন্ন প্রকার মাটি ধান উৎপাদনের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ
তৈরি করে থাকে।
বেলে, লবণাক্ত, অম্লীয় বা ক্ষারীয় মাটিতে চাষাবাদ করলে কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির
সম্মুখীন হন প্রতিনিয়ত।
আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মাটি পরীক্ষা করে উপযুক্ত ফসল নির্বাচন করা এখন সময়ের
দাবি সবার জন্য।
মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব সার ব্যবহারের মাধ্যমে অনুর্বর জমিকে
পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালানো উচিত।
অনুপযোগী জমিতে জোর করে ধান চাষ না করে বিকল্প কোনো লাভজনক ফসল চাষ করা যেতে
পারে।
সরকার ও কৃষি কর্মকর্তাদের উচিত প্রান্তিক চাষিদের মাটির গুণাগুণ সম্পর্কে সচেতন
করে তোলা দ্রুত।
বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদ পদ্ধতি অবলম্বন করলে সীমিত সম্পদ দিয়েও সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া
সম্ভব হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায় যে মাটির প্রকৃতি বুঝে ধানের জাত নির্বাচন করাই হলো সফল কৃষির
মূলমন্ত্র।
প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সঠিক ভূমিতে চাষাবাদ করলে আমাদের কৃষি অর্থনীতি হবে
আরও সমৃদ্ধ।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাটির উর্বরতা রক্ষা করা আমাদের সকলের নৈতিক ও সামাজিক
দায়িত্ব একটি।
সঠিক পরিকল্পনা এবং উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কেবল ধান উৎপাদনে
স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।



এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url