বাংলাদেশের কোন জেলায় গমের চাষ ভালো হয়
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির এক অপরিহার্য নাম ‘গম’। এক সময় এ দেশের খাদ্য তালিকায়
গমের উপস্থিতি ছিল সামান্য, কিন্তু জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও পুষ্টি সচেতনতার কারণে
এখন গম আমাদের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্যে পরিণত হয়েছে। শীতের আমেজ শুরু হতেই
বাংলার দিগন্তজোড়া মাঠে মাঠে যখন সোনালী গমের শীষ দুলতে শুরু করে, তখন কৃষকের
চোখেমুখে ফুটে ওঠে আগামীর স্বপ্ন। মাটির উর্বরতা, অনুকূল আবহাওয়া এবং উচ্চফলনশীল
জাতের ব্যবহারে বর্তমানে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলা গমের ‘ভাণ্ডার’ হিসেবে
আত্মপ্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশে ধানের পর দ্বিতীয় প্রধান দানা জাতীয় খাদ্যশস্য হলো গম। একটা সময় গমের
চাষ উত্তরবঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন জাতের
উদ্ভাবনের ফলে দেশের অনেক জেলাতেই এর বাম্পার ফলন হচ্ছে।আপনার জন্য বাংলাদেশের গম
চাষের ওপর একটি বিস্তারিত আর্টিকেল নিচে দেওয়া হলো:
পেজ সূচিপত্র:বাংলাদেশের কোন জেলায় গমের চাষ ভালো হয়
- গম চাষের প্রেক্ষাপট ও মাটির বৈশিষ্ট্য
- ঠাকুরগাঁও জেলার গমের ঐতিহ্য
- দিনাজপুর ও উত্তরাঞ্চলের ভূমিকা
- পঞ্চগড় ও নীলফামারীর কৃষি চিত্র
- পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের অবদান
- চাষাবাদের উপযুক্ত সময় ও আবহাওয়া
- উন্নত জাতের বীজ ও প্রযুক্তির ব্যবহার
- সার ব্যবস্থাপনা ও সেচ প্রয়োগ
- রোগবালাই দমন ও ফলন বৃদ্ধি
- উপসংহার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
১. গম চাষের প্রেক্ষাপট ও মাটির বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশে ধান প্রধান ফসল হলেও দ্বিতীয় প্রধান দানা শস্য হিসেবে গমের জনপ্রিয়তা
বর্তমানে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটি গমের ফলনের জন্য সবচাইতে
উপযোগী বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময় অভিমত দিয়েছেন। সাধারণত বাংলাদেশের
উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে গমের চাষ সবচাইতে বেশি হয় কারণ সেখানকার মাটির গঠন বেশ
বিশেষ প্রকৃতির। শীতপ্রধান আবহাওয়া গমের ফলন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে যা দেশের উত্তর
জনপদে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিরাজ করে থাকে। গমের গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে
না বিধায় উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি। সঠিক উপায়ে জমি
প্রস্তুত করলে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং গমের শিকড় দ্রুত ছড়াতে সক্ষম
হয়। মাটির অম্লতা বা ক্ষারত্ব নিয়ন্ত্রণে থাকলে গমের দানার পুষ্টিগুণ ও আকার
দুই-ই বেশ ভালো এবং উন্নত মানের হয়। আধুনিক চাষ পদ্ধতিতে মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা
করে চাষ শুরু করলে ফলন কয়েক গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। তাই উপযুক্ত জমি
নির্বাচনই হলো সফলভাবে গম চাষের প্রথম এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ বা
স্তর।
২. ঠাকুরগাঁও জেলার গমের ঐতিহ্য
বাংলাদেশের গমের রাজধানী বলা হয় ঠাকুরগাঁও জেলাকে কারণ এখানে প্রতি বছর বিপুল
পরিমাণ জমিতে গমের আবাদ করা হয়। এই জেলার আবহাওয়া এবং মাটির গুণাগুণ গমের জন্য
এতটাই সহায়ক যে এখানকার কৃষকরা গমের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। প্রতি বছর জেলা কৃষি
সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় যা কৃষকরা
নিয়মিতভাবে ছাড়িয়ে যান। ঠাকুরগাঁওয়ের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠগুলোতে শীতের সকালে গমের
কচি চারার সবুজ সমারোহ যে কাউকেই মুগ্ধ করে তুলতে পারে খুব সহজে। স্থানীয় কৃষকরা
এখন সনাতন পদ্ধতির বদলে আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে গম রোপণ এবং মাড়াই করার
কাজগুলো সম্পন্ন করে থাকেন। উন্নত জাতের বারি গম-৩৩ বা বারি গম-৩৫ এর মতো জাতগুলো
এখানে বর্তমানে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে চাষিদের মাঝে। সরকারি প্রণোদনা এবং সঠিক
পরামর্শ পাওয়ায় এই জেলার শিক্ষিত যুবকরাও এখন বাণিজ্যিকভাবে গম চাষে উৎসাহিত হয়ে
এগিয়ে আসছেন। উৎপাদিত গমের মান ভালো হওয়ায় দেশের বড় বড় আটা ও ময়দা উৎপাদনকারী
মিলগুলো এখান থেকে সরাসরি গম সংগ্রহ করে। ঠাকুরগাঁওয়ের গমের সুখ্যাতি এখন সারা
দেশে ছড়িয়ে পড়েছে যা স্থানীয় অর্থনৈতিক অবস্থাকে অনেক বেশি মজবুত এবং শক্তিশালী
করেছে।
৩. দিনাজপুর ও উত্তরাঞ্চলের ভূমিকা
দিনাজপুর জেলাও গম উৎপাদনের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একটি এলাকা
হিসেবে নিজের অবস্থান বেশ শক্তভাবে পাকাপোক্ত করেছে। এখানকার কৃষকরা বহু বছর ধরে
ধান চাষের পাশাপাশি শীত মৌসুমে গমের আবাদকে লাভজনক পেশা হিসেবে গ্রহণ করে আসছেন।
মাটির উর্বরতা এবং দীর্ঘস্থায়ী শীতকাল এই অঞ্চলে গমের বাম্পার ফলন নিশ্চিত করতে
সবচাইতে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। দিনাজপুরের বিভিন্ন উপজেলা যেমন বীরগঞ্জ বা
কাহারোলে মাইলের পর মাইল গমের খেত দেখলে কৃষির সমৃদ্ধি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলা যেমন কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটেও এখন চরাঞ্চলে উন্নত
জাতের গমের চাষ বেশ সাফল্যের সাথে করা হচ্ছে। নদী বিধৌত পলি মাটিতে গমের দানা বেশ
পুষ্ট হয় যা বাজারে ভালো দাম পেতে কৃষকদের অনেক সাহায্য করে। উত্তরাঞ্চলের এই
জেলাগুলো যদি নিয়মিতভাবে সরকারি সহায়তা পায় তবে গম উৎপাদনে বাংলাদেশ
স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে অনেক ধাপ এগিয়ে যাবে। প্রতি বছর এই অঞ্চলে কৃষি মেলা এবং
প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয় যা নতুন চাষিদের আধুনিক পদ্ধতিতে উদ্বুদ্ধ করে। পরিবহন
ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার ফলে উত্তরবঙ্গের গম দ্রুত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে
যাচ্ছে যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখছে।
৪. পঞ্চগড় ও নীলফামারীর কৃষি চিত্র
দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়েও এখন ধানের পাশাপাশি গমের ফলন অত্যন্ত
আশাব্যঞ্জক এবং কৃষকদের জন্য বেশ লাভজনক হয়ে উঠেছে। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত
হওয়ায় এই জেলায় শীতের প্রকোপ বেশি থাকে যা গমের পরাগায়ন প্রক্রিয়ায় দারুণভাবে
সাহায্য করে থাকে।
নীলফামারী জেলার উঁচু জমিগুলোতেও এখন গমের চাষাবাদ উল্লেখযোগ্য
হারে বৃদ্ধি পেয়েছে যা স্থানীয় অর্থনীতির চিত্র বদলে দিতে শুরু করেছে। কৃষকরা এখন
বিএডিসির সরবরাহকৃত মানসম্মত বীজ ব্যবহার করছেন যার ফলে ফসলের রোগবালাই আগের
তুলনায় অনেক কমে এসেছে। পঞ্চগড়ের কৃষকরা একই জমিতে ফসলের পর্যায়ক্রমিক চাষের
মাধ্যমে মাটির উর্বরতা ধরে রাখার আধুনিক কৌশল আয়ত্ত করে নিয়েছেন সফলভাবে। বৃষ্টির
অভাব থাকলেও এই জেলাগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে সেচ দিয়ে গমের ফলন সুনিশ্চিত
করা সম্ভব হচ্ছে প্রতিদিনের প্রচেষ্টায়। শীতের শেষে যখন গম সোনালি রঙ ধারণ করে
তখন মাঠের দৃশ্যপট এক অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে যা কৃষকের মুখে হাসি ফোটায়।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষকদের সময়মতো সার ও বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়
যাতে চাষাবাদে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। গমের খড় গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় যা
কৃষকদের অতিরিক্ত আয়ের একটি পথ হিসেবে কাজ করে এই অঞ্চলে।
আরো পড়ুন:কৃষিকাজ কোন ধরনের কর্মকান্ড
৫. পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের অবদান
উত্তরবঙ্গের বাইরে পাবনা এবং রাজশাহী জেলা গমের বাণিজ্যিক চাষের জন্য দেশব্যাপী
অত্যন্ত পরিচিত এবং সফল হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। পদ্মা নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে
পলি মিশ্রিত মাটি গমের শিকড় বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত চমৎকার এবং উপযোগী পরিবেশ
প্রদান করে থাকে। বিশেষ করে পাবনার ইশ্বরদী ও চাটমোহর এলাকায় গমের আবাদ দিন দিন
বৃদ্ধি পাচ্ছে যা একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত। রাজশাহী অঞ্চলের খরাপ্রবণ
এলাকাগুলোতেও কম পানিতে চাষ করা যায় এমন জাতের গমের উদ্ভাবন কৃষি খাতে বিপ্লব
নিয়ে এসেছে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সেচ সুবিধা এই অঞ্চলে গম চাষকে
আরও সহজ এবং কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে বর্তমানে। এখানকার কৃষকরা গমের
পাশাপাশি সাথী ফসল হিসেবে সরিষা বা মসুর ডাল চাষ করে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার
নিশ্চিত করছেন। পাবনা ও রাজশাহীর গম স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের
অন্যান্য বড় শহরে নিয়মিতভাবে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। গবেষকরা এই অঞ্চলে তাপ সহনশীল
গমের জাত নিয়ে কাজ করছেন যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গমের ফলন ব্যাহত না হয়।
আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় এখানকার কৃষকরা সরাসরি পাইকারদের কাছে ভালো দামে
গম বিক্রি করার সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন।
৬. চাষাবাদের উপযুক্ত সময় ও আবহাওয়া
গমের কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে হলে সঠিক সময়ে বীজ বপন করা অত্যন্ত জরুরি কারণ এটি একটি
সংবেদনশীল রবি শস্য হিসেবে পরিচিত। সাধারণত বাংলাদেশে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি
থেকে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময়কে গম বপনের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে ধরা
হয়। খুব বেশি আগে বা খুব দেরিতে বীজ বপন করলে গমের ফলন ও দানার গুণগত মান দুটিই
মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গমের চারা অবস্থায় এবং শিষ বের হওয়ার সময়
মৃদু ঠান্ডা আবহাওয়া ফসলের জন্য আশীর্বাদ স্বরূপ কাজ করে দীর্ঘ সময়। অতিরিক্ত
তাপমাত্রার কারণে গমের জীবনকাল সংক্ষিপ্ত হয়ে যেতে পারে যা দানার ওজন এবং আকার
অনেক কমিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। গমের বাড়ন্ত পর্যায়ে দিনের দৈর্ঘ্য এবং
সূর্যালোকের পরিমাণ ফসলের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে
থাকে সবসময়। যদি ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে হঠাৎ করে গরম বাতাস প্রবাহিত হয় তবে
গমের দানা চিটা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে এবং
মাটির আর্দ্রতা বুঝে বীজ বপন করলে কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখতে পারেন প্রতি
বছর। সঠিক সময়ে চাষাবাদ শুরু করলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে ফসল রক্ষা করা
অনেক সহজ এবং সুবিধাজনক হয়ে ওঠে কৃষকের জন্য।
৭. উন্নত জাতের বীজ ও প্রযুক্তির ব্যবহার
বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট গমের অনেকগুলো
উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে যা কৃষির জন্য মাইলফলক। বারি গম-২৮, ৩০, ৩৩ এবং
নবীনতম জাতগুলো ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন হওয়ায় কৃষকদের কাছে অত্যন্ত
নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে। উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের ফলে এখন প্রতি হেক্টরে গমের
উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে যা একটি বড় সাফল্য। ড্রিল মেশিনের
সাহায্যে লাইনে বীজ বপন করলে বীজের অপচয় কমে এবং প্রতিটি চারা সমানভাবে পুষ্টি ও
আলো বাতাস পায়। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এখন শ্রমিক সংকট থাকা সত্ত্বেও বড় বড়
জমিগুলোতে খুব অল্প সময়ে গমের আবাদ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। পাওয়ার টিলার ও
ট্রাক্টরের মাধ্যমে জমি চাষ করার ফলে মাটি দ্রুত ঝুরঝুরে হয় যা গমের চারা গজানোর
জন্য সহায়ক। ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমেও এখন বড় খামারগুলোতে ফসলের স্বাস্থ্য
পর্যবেক্ষণ এবং পোকামাকড় শনাক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে কিছু কিছু এলাকায়। উন্নত
বীজের পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সাথে পরিচিত করতে সরকারি ও
বেসরকারি সংস্থাগুলো নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কৃষকরা এখন স্মার্টফোন অ্যাপের
মাধ্যমে ফসলের সমস্যা সমাধান এবং আবহাওয়ার তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করতে পারছেন
যা অনেক বড় অর্জন।
৮. সার ব্যবস্থাপনা ও সেচ প্রয়োগ
গমের অধিক ফলন নিশ্চিত করতে সুষম সার প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই কারণ পুষ্টিহীন
মাটিতে গমের ফলন অত্যন্ত নগণ্য হয়। জমি তৈরির শেষ পর্যায়ে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি
এবং জিপসাম সার পরিমাণমতো প্রয়োগ করলে চারা দ্রুত এবং সতেজভাবে বেড়ে ওঠে। বিশেষ
করে বোরন সারের অভাব হলে গমের দানা গঠনে সমস্যা দেখা দেয় তাই অনুপুষ্টির দিকে
বিশেষভাবে নজর রাখা প্রয়োজন। গমের জীবনচক্রে সাধারণত দুই থেকে তিনটি সেচ প্রয়োগ
করলে ভালো ফলন পাওয়া যায় যা কৃষকদের সবসময় মাথায় রাখতে হয়। প্রথম সেচটি দিতে হয়
বীজ বপনের ২০-২৫ দিন পর যখন চারার শিকড় বা মুকুট মূল বের হতে শুরু করে মাটিতে।
দ্বিতীয় সেচটি শিষ আসার আগে এবং তৃতীয় সেচটি দানা গঠনের সময় দিলে গমের ওজন এবং
উজ্জ্বলতা দুই-ই বৃদ্ধি পায়। তবে জমিতে পানি জমিয়ে রাখা যাবে না কারণ জলাবদ্ধতা
গমের গাছের গোড়া পচিয়ে দিতে পারে এবং ফলন নষ্ট করে দেয়। সুষম সার এবং নিয়ন্ত্রিত
সেচ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একজন কৃষক খুব সহজেই গমের উৎপাদন খরচ কমিয়ে মুনাফা
বৃদ্ধি করতে পারেন। স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সারের
মাত্রা নির্ধারণ করা হলে পরিবেশের ভারসাম্যও সুন্দরভাবে বজায় রাখা সম্ভব হয়।
৯. রোগবালাই দমন ও ফলন বৃদ্ধি
গমের প্রধান শত্রু হিসেবে বর্তমানে ব্লাস্ট রোগকে চিহ্নিত করা হয়েছে যা অনেক সময়
পুরো মাঠের ফসল ধ্বংস করে দিতে পারে।
এই রোগ দমনের জন্য আগে থেকেই ছত্রাকনাশক
ব্যবহার করা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জাত নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি কাজ।
পাতা ঝলসানো রোগ বা মরিচা রোগও মাঝে মাঝে গমের ফলন কমিয়ে দেয় তাই নিয়মিত জমি
পরিদর্শন করা প্রয়োজন কৃষকদের। ইঁদুরের উপদ্রব থেকে ফসল রক্ষা করতে হলে
এলাকাভিত্তিক সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম পদ্ধতি প্রয়োগ করা অনেক বেশি
কার্যকর। ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করলে পরিবেশের ক্ষতি কম হয়
এবং উৎপাদিত গমের মানও অনেক ভালো থাকে। সঠিক সময়ে ফসল সংগ্রহ না করলে অতিরিক্ত
রোদে দানা ফেটে যেতে পারে বা ঝরে পড়তে পারে যা অপচয় বাড়িয়ে দেয়। মাড়াই করার পর গম
ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে আর্দ্রতা ১২ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনলে তা দীর্ঘকাল সংরক্ষণ
করা অনেক সহজ হয়। আধুনিক গুদামজাতকরণ পদ্ধতি অনুসরণ করলে গমের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়
না এবং পোকার আক্রমণ থেকেও ফসল পুরোপুরি নিরাপদ থাকে সবসময়। কৃষকরা যদি সচেতন
থাকেন এবং নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন তবে প্রতি বছর গমের ফলন
উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব।
১০. উপসংহার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
পরিশেষে বলা যায় যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল তথা ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও পাবনা
অঞ্চল গম চাষের জন্য এক অপার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। ধানের ওপর চাপ কমাতে এবং খাদ্য
তালিকায় পুষ্টির বৈচিত্র্য আনতে গমের উৎপাদন বাড়ানো এখন সময়ের দাবি এবং জাতীয়
লক্ষ্য। সরকারি সহযোগিতা, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ এবং উন্নত বীজ সরবরাহ করতে
পারলে বাংলাদেশ অচিরেই গম রপ্তানি করার সক্ষমতা অর্জন করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় খরা ও তাপ সহনশীল জাতের উদ্ভাবন আমাদের কৃষি গবেষণার এক
অনন্য সাফল্যের উদাহরণ হয়ে থাকবে। তরুণ সমাজ যদি কৃষিতে আধুনিকায়ন নিয়ে আসে তবে
গম চাষ একটি লাভজনক শিল্প হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। সঠিক
বাজারজাতকরণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকরা তাদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির
সঠিক মূল্য পাবেন এবং গ্রামীণ জীবন সমৃদ্ধ হবে। আমাদের মাটির উর্বরতা এবং কৃষকের
কঠোর পরিশ্রমই হলো এই দেশের মূল শক্তি যা গমের সোনালি শীষের মাধ্যমে প্রতিফলিত
হয়। সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা গমের আবাদকে আরও ছড়িয়ে দিতে
পারি যা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবে। গমের সোনালি স্বপ্ন জয় করে বাংলাদেশ
এগিয়ে যাবে এক সমৃদ্ধ আগামীর পথে যেখানে কোনো অভাব বা ক্ষুধার স্থান থাকবে না।



এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url