গ্রিনপিস কোন দেশের পরিবেশবাদী গ্রুপ গ্রিনপিস ধরিত্রীর অকুতোভয় পাহারাদার
সবুজ ও শান্তিময় একটি পৃথিবীর স্বপ্ন নিয়ে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা বিশ্বের
সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সাহসী পরিবেশবাদী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৫ সালের পর যখন
বিশ্ব পারমাণবিক যুদ্ধের আতঙ্কে কাঁপছিল এবং প্রকৃতি মানুষের লোভের বলি হচ্ছিল,
ঠিক তখনই একদল নিবেদিতপ্রাণ স্বপ্নদ্রষ্টা গড়ে তোলেন গ্রিনপিস। কোনো নির্দিষ্ট
রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি না করে এবং করপোরেট বা সরকারি অনুদান প্রত্যাখ্যান করে
গ্রিনপিস আজ হয়ে উঠেছে পৃথিবীর এক অকুতোভয় পাহারাদার। সমুদ্রের গভীর থেকে শুরু
করে গহীন বনভূমি—প্রকৃতি যেখানেই বিপন্ন, গ্রিনপিস সেখানেই এক প্রতিবাদী
কণ্ঠস্বর।
গ্রিনপিস (Greenpeace) কোনো নির্দিষ্ট একটি দেশের সংগঠন নয়, বরং এটি একটি
আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংস্থা। তবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে কানাডার
ব্রিটিশ কলাম্বিয়া অঙ্গরাজ্যের ভ্যাঙ্কুভার শহর থেকে। বর্তমানে ৪০টিরও বেশি দেশে
এর শাখা রয়েছে এবং এর সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে অবস্থিত আপনার
অনুরোধ অনুযায়ী "গ্রিনপিস: ধরিত্রীর অকুতোভয় পাহারাদার" শিরোনামে একটি আর্টিকেল
নিচে দেওয়া হলো:
পেজ সূচিপত্র:গ্রিনপিস কোন দেশের পরিবেশবাদী গ্রুপ গ্রিনপিস ধরিত্রীর অকুতোভয় পাহারাদার
১. সূচনার প্রেক্ষাপটে গ্রিনপিস
গ্রিনপিস কোনো সাধারণ সংস্থা নয় বরং এটি পৃথিবীর আর্তনাদে সাড়া দেওয়া একদল
সাহসী মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। ১৯৭১ সালে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার উপকূলে একদল
দুঃসাহসী মানুষ যখন ছোট এক নৌকায় চড়ে পারমাণবিক পরীক্ষার বিরুদ্ধে যাত্রা
করেছিলেন, তখনই জন্ম নেয় গ্রিনপিস। তারা বিশ্বাস করতেন যে ক্ষুদ্র পদক্ষেপই বড়
পরিবর্তনের সূত্রপাত করতে পারে এবং সেই বিশ্বাস আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর
বুক থেকে অবিচার দূর করে প্রকৃতিকে তার আদি রূপে ফিরিয়ে দেওয়াই ছিল তাদের একমাত্র
আদি লক্ষ্য। কোনো দেশ বা রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা নয় বরং ধরিত্রীর সুরক্ষাই তাদের
একমাত্র চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। দশকের পর দশক ধরে তারা বিশ্ববাসীর বিবেককে
নাড়া দিয়ে আসছে তাদের ভিন্নধর্মী এবং সাহসী সব কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে। এটি আজ
বিশ্বের ৫৫টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে থাকা এক বিশাল নেটওয়ার্ক যা কোটি কোটি মানুষের
ভরসার স্থল। পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এই সংগঠনটি প্রকৃতপক্ষেই এক
অকুতোভয় পাহারাদারের ভূমিকা নিরলসভাবে পালন করে চলেছে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে
গ্রিনপিস কেবল একটি নাম নয় বরং এটি ধরিত্রীর অস্তিত্ব রক্ষার এক জীবন্ত সংগ্রাম।
২. অকুতোভয় অভিযানের মূলমন্ত্র
অহিংস কিন্তু সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া গ্রিনপিসের অভিযানের মূল ভিত্তি যা তাদের
অন্যান্য সংগঠন থেকে আলাদা করে রাখে। তারা বিশ্বাস করে যে অন্যায়কে কেবল আলোচনার
টেবিলে নয় বরং সরাসরি চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে রুখে দিতে হয়। যখনই কোনো কর্পোরেট দানব
বা শক্তিশালী দেশ পরিবেশ বিরোধী কাজে লিপ্ত হয় গ্রিনপিস সেখানে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
তারা বিশালাকার জাহাজের সামনে ক্ষুদ্র নৌকা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ার সাহস দেখায় যা
বিশ্বের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই অকুতোভয় মানসিকতা তাদের কর্মীদের মধ্যে
সঞ্চারিত হয় যারা নিজেদের জীবন বিপন্ন করে হলেও প্রকৃতিকে রক্ষা করে। তাদের
প্রতিটি অভিযানে থাকে সৃজনশীলতা এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ যা
সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরে। গোপন তথ্য ফাঁস করা থেকে শুরু করে প্রকাশ্য প্রতিবাদ
সবখানেই তারা এক নির্ভীক ও আপসহীন সত্তার পরিচয় দেয়। এই সংকল্পই তাদের বিশ্বজুড়ে
কোটি কোটি পরিবেশপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে দিয়েছে
প্রতিনিয়ত। ক্ষমতার দাপটকে উপেক্ষা করে সত্যের পথে চলাই গ্রিনপিসের মূলমন্ত্র যা
পৃথিবীকে সুন্দর রাখার এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের নাম।
৩. সমুদ্রের নীলিমায় অতন্দ্র প্রহরী
সমুদ্রের তলদেশের বাস্তুসংস্থান রক্ষা এবং তিমিনাশ ও অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ বন্ধে
গ্রিনপিস এক অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে। তাদের বিখ্যাত জাহাজগুলো যেমন
'রেইনবো ওয়ারিয়র' নীল জলরাশির বুকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক জলন্ত প্রতীক হয়ে
ভেসে বেড়ায় চিরকাল। গভীর সমুদ্রে তিম শিকারিদের জাহাজকে বাধা দেওয়া থেকে শুরু করে
সমুদ্রে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা রোধে তারা কাজ করে। সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য রক্ষা না
পেলে মানবজাতির অস্তিত্বও বিপন্ন হবে এই সত্যটি তারা বারবার বিশ্ব দরবারে তুলে
ধরেছে। কোরাল রিফ ধ্বংস হওয়া কিংবা সমুদ্রে তেলের খনি খননের বিরুদ্ধে তাদের
প্রতিবাদ সবসময়ই তীব্র এবং অত্যন্ত কার্যকর। তারা মনে করে সমুদ্র কোনো ডাস্টবিন
নয় বরং এটি পৃথিবীর ফুসফুসের মতো যা আমাদের অক্সিজেন যোগান দিয়ে থাকে। অনেক সময়
তারা সরাসরি সমুদ্রে নেমে গিয়ে মৎস্য শিকারি বড় ট্রলারগুলোর পথ রোধ করে সাহসী
দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে এবং জলপথে তাদের এই
দ্বিমুখী সংগ্রাম সমুদ্রকে এখনো অনেক বিপদ থেকে রক্ষা করছে। গ্রিনপিসের এই সমুদ্র
রক্ষা আন্দোলন আগামী প্রজন্মের জন্য এক নীল ও সুন্দর মহাসাগর নিশ্চিত করার জন্য
অত্যন্ত জরুরি।
৪. জলবায়ু পরিবর্তন রোধে আপসহীন
জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে ধরিত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি এবং গ্রিনপিস এই সংকটের
বিরুদ্ধে প্রথম সারির এক যোদ্ধা। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর জন্য তারা
বিশ্বের বড় বড় শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর নিরন্তর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে বহু বছর।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে তারা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করে সবুজ শক্তির দিকে
এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায় সব সময়। মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়া রোধে তাদের 'সেভ
দ্য আর্কটিক' ক্যাম্পেইন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সমর্থন পেয়েছে। তারা মনে
করে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশের সমস্যা নয় বরং এটি একটি মানবাধিকার এবং
সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন। উন্নত দেশগুলোর ভোগবিলাসের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর
মানুষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে তারা তীক্ষ্ণ নজর রাখে সবসময়। কয়লা ভিত্তিক
বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং তেলের পাইপলাইনের বিরুদ্ধে তাদের সাহসী অবস্থান অনেক বড় বড়
প্রকল্প বন্ধে ভূমিকা রেখেছে। তারা বিজ্ঞানীদের গবেষণাকে সাধারণ মানুষের কাছে
সহজবোধ্য করে তোলে যাতে সবাই এই বিপদের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে। গ্রিনপিসের এই
নিরলস চেষ্টার কারণেই আজ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান
আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হতে পেরেছে।
৫. পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও শান্তি
পারমাণবিক পরীক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মাধ্যমেই গ্রিনপিসের যাত্রা শুরু হয়েছিল
এবং সেই ধারা আজও তারা সগৌরবে বজায় রেখেছে। পারমাণবিক অস্ত্র কেবল মানুষ নয় বরং
সমগ্র ধরিত্রীর পরিবেশকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে বলে তারা মনে করে।
প্রশান্ত মহাসাগরে ফ্রান্সের পারমাণবিক পরীক্ষার বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘকালীন লড়াই
ইতিহাসের পাতায় এক স্বর্ণাক্ষরে লেখা সাহসী অধ্যায় হয়ে আছে। গ্রিনপিস বিশ্বাস করে
যে পৃথিবীতে শান্তি বজায় রাখতে হলে পারমাণবিক শক্তির সামরিক ব্যবহারের অবসান
ঘটানো একান্তভাবে প্রয়োজন। পারমাণবিক বর্জ্য অপসারণের অব্যবস্থাপনা পরিবেশের যে
দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে সে সম্পর্কে তারা সবসময় বিশ্ববাসীকে নিয়মিত সতর্ক করে।
তারা কেবল প্রতিবাদই করে না বরং পারমাণবিক শক্তির বিকল্প হিসেবে নিরাপদ জ্বালানির
প্রয়োজনীয়তার কথা জোরালোভাবে প্রচার করে। অসংখ্যবার তাদের কর্মীরা পারমাণবিক
স্থাপনায় ঢুকে প্রতীকী প্রতিবাদ জানিয়ে নিরাপত্তার গলদগুলো আঙুল দিয়ে দেখিয়ে
দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। গ্রিনপিসের এই শান্তি আন্দোলন আসলে ধরিত্রীকে এক মহাপ্রলয়ের
হাত থেকে রক্ষা করার এক অবিরাম এবং নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা মাত্র। তারা স্বপ্ন দেখে
এমন এক পৃথিবীর যেখানে কোনো তেজস্ক্রিয়তা থাকবে না এবং মানুষ নির্ভয়ে মুক্ত
বাতাসে নিঃশ্বাস নেবে।
৬. বনভূমি রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য
পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে পরিচিত আমাজন থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়ার রেইনফরেস্ট
রক্ষায় গ্রিনপিস নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে আজ। বন উজাড় করার ফলে বন্যপ্রাণীদের
আবাসস্থল ধ্বংস হওয়া এবং জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তির বিরুদ্ধে তারা এক দুর্ভেদ্য
দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় বড় কোম্পানিগুলো যখন পাম অয়েল বা সয়ার জন্য বন ধ্বংস করে
তখন গ্রিনপিস তাদের মুখোশ খুলে দেয়। তারা স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে বনের
ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ সংগ্রহ করে তা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরে জনমত গঠন করে।
বনের ওপর নির্ভরশীল আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় গ্রিনপিস সবসময় সোচ্চার থাকে কারণ
তারা প্রকৃতির প্রকৃত এবং আদিম সন্তান। তারা মনে করে একটি গাছ কাটা মানে কেবল কাঠ
নয় বরং একটি বিশাল বাস্তুসংস্থানকে চিরতরে হত্যা করা। বন্যপ্রাণী পাচার রোধ এবং
সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণার দাবিতে তারা সরকারগুলোর ওপর প্রবল রাজনৈতিক ও সামাজিক
চাপ সৃষ্টি করে। গ্রিনপিসের কর্মীরা অনেক সময় বনের ভেতরে গিয়ে অবস্থান ধর্মঘট করে
গাছ কাটার মেশিনগুলোকে আটকে দেওয়ার সাহস দেখায়। বনের প্রতিটি প্রাণের নিরাপত্তা
নিশ্চিত করা এবং সবুজ প্রকৃতি ধরে রাখা তাদের এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
৭. প্লাস্টিক দূষণমুক্ত পৃথিবীর স্বপ্ন
প্লাস্টিক দূষণ আধুনিক সভ্যতার এক অভিশাপ এবং এই অভিশাপ থেকে ধরিত্রীকে মুক্ত
করতে গ্রিনপিস জোরালো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক
উৎপাদন বন্ধে তারা বিশ্বের নামি-দামি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে
একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে বললে ভুল হবে না। সমুদ্র সৈকত এবং নদীর পাড়ে
প্লাস্টিক আবর্জনা পরিষ্কার করার পাশাপাশি তারা এর উৎসমুখ বন্ধ করার দাবি জানায়।
গ্রিনপিস মনে করে প্লাস্টিক কেবল দৃশ্যমান আবর্জনা নয় বরং এটি মাইক্রোপ্লাস্টিক
হিসেবে আমাদের খাদ্যচক্রেও বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারা ভোক্তাদের সচেতন করার মাধ্যমে
প্লাস্টিক পণ্য বর্জনের ডাক দেয় এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত
করে। রিফিল এবং রিইউজ কালচার প্রবর্তনের জন্য তারা বিভিন্ন শহরে বড় বড় ক্যাম্পেইন
পরিচালনা করে সারা বছর ধরে। প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা নিয়ে তাদের তৈরি
তথ্যচিত্রগুলো মানুষের চিন্তাধারায় বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে
ইদানীং। তারা এমন এক আইনি কাঠামোর দাবি করে যেখানে দূষণকারী কোম্পানিগুলোকেই
তাদের আবর্জনার দায়ভার গ্রহণ করতে বাধ্য করা হবে। গ্রিনপিসের এই লড়াই আসলে আমাদের
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি স্বচ্ছ এবং সুস্থ পৃথিবী উপহার দেওয়ার এক মহৎ সংগ্রাম।
৮. পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির প্রসার
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সূর্য ও বাতাসের শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে
এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায় গ্রিনপিস। তারা মনে করে শক্তি উৎপাদনের জন্য
পরিবেশ ধ্বংস করার কোনো প্রয়োজন নেই কারণ প্রকৃতিতেই অফুরন্ত শক্তির উৎস
বিদ্যমান। কয়লা এবং গ্যাসের পরিবর্তে সৌর প্যানেল ও বায়ুকলের প্রসার ঘটাতে তারা
বিভিন্ন দেশের সরকারকে কারিগরি পরামর্শ দেয়। গ্রিনপিসের গবেষণাপত্রগুলো প্রমাণ
করে দিয়েছে যে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি কেবল পরিবেশবান্ধব নয় বরং দীর্ঘমেয়াদে এটি
অত্যন্ত সাশ্রয়ীও বটে। তারা সাধারণ মানুষকে নিজের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে
উৎসাহিত করে এবং জ্বালানি স্বাধীনতার কথা গুরুত্ব দিয়ে বলে। বড় বড় তেল
কোম্পানিগুলোর লবিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা সবুজ শক্তি বা 'গ্রিন এনার্জি'র
পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এই শক্তির রূপান্তরই
একমাত্র কার্যকর উপায় বলে গ্রিনপিস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে সবসময়। তারা বিভিন্ন
উন্নয়নশীল দেশে ছোট ছোট গ্রিড তৈরির মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া মানুষের কাছে আলো পৌঁছে
দেওয়ার কাজও করে। গ্রিনপিসের এই মিশনটি আসলে ধরিত্রীর তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে
রাখার এবং একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার এক বৈপ্লবিক দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ।
৯. জনসচেতনতা ও বৈশ্বিক সংহতি
গ্রিনপিস কেবল একটি সংগঠন নয় বরং এটি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এক বিশাল
বিশ্বব্যাপী সামাজিক আন্দোলন। তারা কোনো করপোরেট বা সরকারি অনুদান গ্রহণ করে না
বরং সাধারণ মানুষের ছোট ছোট দানেই তাদের কার্যক্রম চলে।
এটি তাদের নিরপেক্ষতা
বজায় রাখতে এবং সাহসের সাথে কথা বলতে সাহায্য করে যা বর্তমান বিশ্বে বিরল এক
উদাহরণ। পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে তারা পরিবেশ রক্ষার
বার্তাটি সাধারণ মানুষের মনের গহীনে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে তারা কোটি কোটি মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে এক বিশাল
শক্তি তৈরি করেছে। তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশ আন্দোলনে যুক্ত করতে তারা বিশেষ
কর্মশালা এবং শিক্ষামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন দেশে। তারা
বিশ্বাস করে যে সচেতন জনতাই পারে পৃথিবীর ভাগ্য পরিবর্তন করতে এবং শোষক শ্রেণীর
হাত থেকে প্রকৃতিকে বাঁচাতে। গ্রিনপিসের প্রতিটি বিজয় আসলে সাধারণ মানুষের
বিজয়েরই নামান্তর যা প্রমাণ করে একতা থাকলে অসম্ভবকে জয় করা সম্ভব। এই বৈশ্বিক
সংহতিই গ্রিনপিসকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বিশ্বস্ত পরিবেশবাদী সংগঠনে
পরিণত করেছে যা ধরিত্রীর রক্ষাকবচ।
১০. উপসংহার: আগামীর সবুজ পৃথিবী
পরিশেষে বলা যায় যে গ্রিনপিস কেবল ধরিত্রীর পাহারাদার নয় বরং এটি আমাদের সুন্দর
আগামীর এক উজ্জ্বল আশার প্রদীপ। প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে তারা যে সাহসিকতার
পরিচয় দেয় তা বিশ্বের প্রতিটি সচেতন মানুষের জন্য এক বিশাল বড় অনুপ্রেরণা।
প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে যে গভীর ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন তা পুনঃস্থাপনের জন্যই
গ্রিনপিস দীর্ঘ পাঁচ দশক লড়াই করছে। ধরিত্রীর প্রতিটি ইঞ্চি মাটি ও জলভাগকে
সুরক্ষিত রাখতে তাদের এই অকুতোভয় যাত্রা চলতেই থাকবে অনন্তকাল ধরে সম্ভবত। আমরা
যদি তাদের এই লড়াইয়ে শামিল হতে পারি তবেই আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য একটি
বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া সম্ভব। গ্রিনপিস আমাদের শিখিয়েছে যে অন্যায় দেখলে চুপ
করে থাকা অপরাধ এবং প্রকৃতির প্রতি আমাদেরও সমান দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাদের প্রতিটি
ক্যাম্পেইন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীটা আমাদের একার নয় বরং এটি সকল প্রাণের
অভিন্ন আবাসস্থল। অকুতোভয় এই পাহারাদারের ছায়াতলে থেকে আমরাও যেন পৃথিবীকে
ভালোবাসতে শিখি এবং একে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করি। গ্রিনপিসের জয় মানেই
ধরিত্রীর জয় এবং আমাদের বেঁচে থাকার সার্থকতা যা চিরকাল ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল
হয়ে অম্লান থাকবে।



এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url