মহাজাগতিক ছাতা: অতিবেগুনি রশ্মি ও ওজোন স্তর

সূর্য আমাদের সকল শক্তির উৎস। সূর্যের আলো ও তাপ ছাড়া পৃথিবীতে জীবনের স্পন্দন সম্ভব হতো না। তবে সূর্য থেকে আসা এই আলোক রশ্মির সবটুকু কিন্তু আমাদের জন্য কল্যাণকর নয়। সূর্যের বিকিরণের একটি বড় অংশ হলো অতিবেগুনি রশ্মি বা Ultraviolet (UV) Ray। এই রশ্মি যদি সরাসরি পৃথিবীতে এসে পৌঁছাত, তবে প্রাণিজগত ও উদ্ভিদের জন্য তা হতো চরম বিপর্যয়। প্রকৃতির এক অদ্ভুত ও সুনিপুণ কারিগরিতে আমাদের বায়ুমণ্ডলের একটি নির্দিষ্ট স্তর এই মারণঘাতী রশ্মিকে শোষণ করে নেয়, যাকে আমরা ওজোন স্তর বলে জানি।
মহাজাগতিক ছাতা অতিবেগুনি
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল আমাদের জন্য একটি সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে। এই কবচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো ওজোন স্তর, যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মিকে আটকে দিয়ে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।​নিচে অতিবেগুনি রশ্মি শোষণের প্রক্রিয়া এবং এর গুরুত্ব নিয়ে একটি সুন্দর আর্টিকেল দেওয়া হলো:

পেজ সূচিপত্র:মহাজাগতিক ছাতা: অতিবেগুনি রশ্মি ও ওজোন স্তর

​১. মহাজাগতিক ছাতা ও ওজোন স্তরের পরিচিতি

পৃথিবীর চারপাশে জড়িয়ে থাকা বায়ুমণ্ডলের এক অদৃশ্য চাদর হলো ওজোন স্তর যা প্রাণিজগতকে রক্ষা করছে। সূর্য থেকে আসা প্রাণঘাতী রশ্মিগুলোকে প্রতিহত করার কারণে একে মহাজাগতিক ছাতা বা প্রাকৃতিক ঢাল বলা হয়। ওজোন স্তর মূলত ওজোন নামক এক প্রকার গ্যাসের ঘন আবরণ যা পৃথিবীর উপরিভাগে অবস্থান করে। যদি এই স্তর না থাকত তবে সূর্যের তীব্র তেজে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণ কয়েক নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যেত। মহাকাশের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে পৃথিবীকে আগলে রাখার এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং প্রাণদায়ী। ওজোন স্তর ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তন ও টিকে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না বিজ্ঞানীদের মতে। বর্তমান সভ্যতায় এই স্তরের গুরুত্ব অনুধাবন করা আমাদের জন্য টিকে থাকার লড়াইয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধুমাত্র একটি বায়বীয় স্তর নয় বরং পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য এক অপরিহার্য সুরক্ষা কবজ হিসেবে কাজ করে। এই ছাতার গুরুত্ব বুঝেই আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার শপথ নেওয়া এখন সময়ের বড় দাবি।

​২. বায়ুমণ্ডলের গঠন ও স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ভূমিকা

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কয়েকটি স্তরে বিভক্ত এবং এর মধ্যে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার ওজোন স্তরের প্রধান আবাসস্থল। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ থেকে ৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় এই বিশেষ গ্যাসীয় স্তরটি বিস্তৃত হয়ে থাকে। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের উচ্চতর অংশে ওজোনের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে যা একটি প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। বায়ুমণ্ডলের অন্যান্য স্তরের তুলনায় এই স্তরের তাপমাত্রা ও চাপ ওজোন অণু গঠনের জন্য বেশ অনুকূল। সূর্য থেকে আসা উচ্চ শক্তির ফোটন কণা এই স্তরেই প্রথম বাধা পায় এবং শোষিত হয়। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের এই স্থিতিশীল অবস্থা পৃথিবীকে বাইরের মহাজাগতিক দুর্যোগ থেকে নিয়মিত রক্ষা করে চলেছে প্রতিনিয়ত। এই স্তরের বায়ুপ্রবাহ অত্যন্ত শান্ত বিধায় এখানে ওজোন গ্যাস স্থিরভাবে অবস্থান করতে পারে দীর্ঘকাল ধরে। বায়ুমণ্ডলের এই বিন্যাসটি প্রকৃতির এক অনন্য স্থাপত্য যা জীবন ধারণের জন্য এক বিশেষ পরিবেশ তৈরি করেছে। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের নিরাপত্তা ছাড়া আমাদের আবহাওয়া ও জলবায়ু ব্যবস্থা আমূল বদলে যাওয়ার চরম ঝুঁকি থাকত। তাই বায়ুমণ্ডলের এই স্তরটিকে রক্ষা করা আমাদের পরিবেশগত নিরাপত্তার জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

৩. ওজোন গ্যাস সৃষ্টির রাসায়নিক প্রক্রিয়া

ওজোন হলো অক্সিজেনের তিনটি পরমাণু নিয়ে গঠিত একটি বিশেষ অণু যা অত্যন্ত সক্রিয় ও নীলচে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি যখন সাধারণ অক্সিজেন অণুর ওপর পড়ে তখন তা ভেঙে পরমাণুতে পরিণত হয়। এই মুক্ত অক্সিজেন পরমাণু পরবর্তীতে অন্য অক্সিজেন অণুর সাথে যুক্ত হয়ে ওজোন (O_3) তৈরি করে। এই নিরন্তর ভাঙা-গড়ার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বায়ুমণ্ডলে ওজোনের ভারসাম্য বজায় থাকে যা অত্যন্ত চমৎকার। রাসায়নিকভাবে ওজোন একটি অস্থিতিশীল গ্যাস হলেও উচ্চ বায়ুমণ্ডলে এটি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। সূর্যের শক্তি ব্যবহার করেই ওজোন তৈরি হয় এবং সেই শক্তিকেই এটি আবার মহাকাশে ফিরিয়ে দেয়। এই চক্রাকার প্রক্রিয়াটি প্রাকৃতিকভাবেই লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বায়ুমণ্ডলে অবিরামভাবে ঘটে চলেছে নিয়মিত। তবে শিল্পায়ন ও দূষণের ফলে এই প্রাকৃতিক রাসায়নিক চক্রটি বর্তমানে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সবখানে। অক্সিজেনের এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও পরোক্ষভাবে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। ওজোনের এই রাসায়নিক গঠন ও এর উৎপাদন প্রক্রিয়া বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত কৌতূহলের এক বিষয়। আমাদের বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক স্থায়িত্ব রক্ষায় ওজোনের এই অনন্য গঠনশৈলী এক অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।

​৪. অতিবেগুনি রশ্মির প্রকৃতি ও ক্ষতিকারক প্রভাব

সূর্য থেকে আসা রশ্মির একটি বড় অংশ হলো অতিবেগুনি রশ্মি যা তিন প্রকারের হয়ে থাকে। এই তিন প্রকার রশ্মির মধ্যে ইউভি-বি এবং ইউভি-সি হলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর ও বিধ্বংসী।
মহাজাগতিক ছাতা অতিবেগুনি
ওজোন স্তর ইউভি-সি রশ্মিকে শতভাগ এবং ইউভি-বি রশ্মিকে নব্বই শতাংশের বেশি শোষণ করে নেয়। যদি এই রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে আসত তবে তা ডিএনএ-র গঠন পুরোপুরি পাল্টে দিতে সক্ষম হতো। অতিবেগুনি রশ্মি বস্তুর আণবিক বন্ধন ভেঙে ফেলার ক্ষমতা রাখে যা প্রাণের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। গাছের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া এই রশ্মির প্রভাবে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে এবং ফসল নষ্ট হয়। এটি বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক তাপমাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। এই অদৃশ্য বিকিরণ শুধু মানুষের জন্য নয় বরং অণুজীবদের জন্যও এক বড় ধরনের যম স্বরূপ। প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করতে এই অতিবেগুনি রশ্মির সামান্যতম আধিক্যই যথেষ্ট বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অতিবেগুনি রশ্মির এই ধ্বংসাত্মক প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা বর্তমান আধুনিক যুগের এক জরুরি কর্তব্য।

​৫. মানবদেহে অতিবেগুনি রশ্মির নেতিবাচক প্রভাব

সরাসরি অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে আসা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য এক চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এর ফলে ত্বকের ক্যান্সার, অকাল বার্ধক্য এবং মারাত্মক সানবার্নের মতো ভয়াবহ সমস্যা সৃষ্টি হয়ে থাকে। মানুষের চোখের কর্নিয়া ও লেন্স এই রশ্মির প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ছানি পড়ার হার বৃদ্ধি পায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে এটি মানুষকে বিভিন্ন ভাইরাসের প্রতি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল করে তোলে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে শিশুদের কোমল ত্বক ও চোখ এই বিকিরণের প্রভাবে খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ওজোন স্তর পাতলা হওয়ার কারণে বর্তমান বিশ্বে চর্মরোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে দিন দিন। ডিএনএ পরিবর্তনের ফলে জিনগত ত্রুটি নিয়ে শিশু জন্ম নেওয়ার ঝুঁকিও অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চিকিৎসকদের মতে অতিরিক্ত অতিবেগুনি রশ্মি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে দীর্ঘমেয়াদে। স্বাস্থ্যের এই ঝুঁকিগুলো এড়াতে ওজোন স্তরের অটুট থাকা আমাদের জন্য কোনো বিকল্পহীন এক দাবি। নিজেদের রক্ষা করতে হলে আমাদের অবশ্যই এই প্রাকৃতিক ছাতাটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে দ্রুত। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য বিশুদ্ধ বাতাস এবং সুরক্ষিত ওজোন স্তরের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম ও অনস্বীকার্য।

​৬. বাস্তুতন্ত্র ও জলজ প্রাণীর ওপর ওজোন ক্ষয়ের প্রভাব

ওজোন স্তরের অবক্ষয় শুধুমাত্র ডাঙ্গার প্রাণীদের নয় বরং সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে মারা যায় যা খাদ্যশৃঙ্খলের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এর ফলে সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর খাদ্যাভাব দেখা দেয় এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়। স্থলভাগের উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও ফলন এই ক্ষতিকর বিকিরণের কারণে উল্লেখযোগ্য হারে কমে যেতে শুরু করে। বনের বাস্তুসংস্থান নষ্ট হলে বন্যপ্রাণীরা তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারিয়ে বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হয় ক্রমশ। পতঙ্গ ও উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হওয়ার ফলে মাটির উর্বরতা শক্তিও ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে দ্রুত। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের মধ্যে যে নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে তা এই রশ্মির কারণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। বাস্তুতন্ত্রের এই ভারসাম্যহীনতা শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর এক বিশাল বড় আঘাত হানে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়া এবং ঋতুচক্রের পরিবর্তন ওজোন স্তরের ক্ষতির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই জীবজগতকে বাঁচাতে হলে আমাদের অবশ্যই প্রকৃতির এই সুরক্ষাকবচ রক্ষা করার প্রতি মনোযোগী হতে হবে। একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্রই পারে পৃথিবীকে মানুষের বাসের যোগ্য রাখতে এবং প্রাণের স্পন্দন সচল রাখতে।

​৭. ওজোন স্তর ক্ষয়ের কারণ ও ক্লোরোফ্লুরোকার্বন

মানুষের তৈরি বিভিন্ন রাসায়নিক গ্যাস ওজোন স্তর ধ্বংসের প্রধান কারণ হিসেবে বিশ্বজুড়ে চিহ্নিত হয়েছে। ক্লোরোফ্লুরোকার্বন বা সিএফসি গ্যাস ওজোন স্তরের জন্য সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে পরিচিত বর্তমান সময়ে। রেফ্রিজারেটর, এসি এবং অ্যারোসল স্প্রে থেকে নির্গত এই গ্যাস স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছে ওজোন অণু ভেঙে দেয়। একটি ক্লোরিন পরমাণু লক্ষাধিক ওজোন অণুকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে যা অত্যন্ত ভীতিকর ও উদ্বেগের। এছাড়া হ্যালন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড এবং মিথাইল ব্রোমাইডও ওজোন স্তরের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে থাকে। কলকারখানার ধোঁয়া এবং অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলেও বায়ুমণ্ডলে ক্ষতিকর নাইট্রোজেন অক্সাইড বৃদ্ধি পায়। বিলাসবহুল জীবনযাপনের উপকরণগুলোই মূলত আমাদের এই প্রাকৃতিক ছাতাটিকে ছিদ্র করে ফেলছে প্রতিনিয়ত ও সচেতনভাবে। বনভূমি উজাড় করার ফলে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে যা ওজোন পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিজ্ঞানীদের মতে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপই এই মহাজাগতিক সংকটের মূল উৎস এবং এর প্রতিকার জরুরি। আমরা যদি এখনই আমাদের অভ্যাস ও প্রযুক্তি না বদলাই তবে এই ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে যাবে।

​৮. ওজোন স্তরের বর্তমান অবস্থা ও ওজন হোল

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বিজ্ঞানীরা অ্যান্টার্কটিকার আকাশে ওজোন স্তরে একটি বিশাল বড় গহ্বর খুঁজে পান।
মহাজাগতিক ছাতা অতিবেগুনি
একে 'ওজোন হোল' বলা হয় যা প্রমাণ করে যে আমাদের সুরক্ষা কবচটি বিপন্ন হয়ে পড়েছে। প্রতি বছর বসন্তকালে দক্ষিণ মেরুর আকাশে এই গহ্বরটি সবচেয়ে বড় আকারে দেখা দেয় যা বিপজ্জনক। নাসার স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে যে ওজোনের ঘনত্ব বিশ্বব্যাপী গড়ে অনেকখানি কমে গেছে গত কয়েক দশকে। উত্তর মেরুর আকাশেও মাঝে মাঝে ওজোনের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায় যা আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলছে। ওজোন স্তরের এই পাতলা হয়ে যাওয়া মূলত মেরু অঞ্চলের বায়ুপ্রবাহ এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার সংমিশ্রণ। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ছিদ্রটি কিছুটা মেরামত হওয়ার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে যা ইতিবাচক খবর। তবুও এটি সম্পূর্ণ আগের অবস্থায় ফিরে যেতে কয়েক দশক সময় নেবে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। ওজোন হোলের বিস্তার বৃদ্ধি পেলে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়বে নিশ্চিতভাবে। ওজোন স্তরের বর্তমান এই নাজুক অবস্থা আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা যে প্রকৃতিকে অবহেলা করা সাজে না।

​৯. বৈশ্বিক সচেতনতা ও মন্ট্রিল প্রোটোকল

ওজোন স্তরের এই মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি রোধে ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক 'মন্ট্রিল প্রোটোকল'। বিশ্বের দেশগুলো সিএফসি ও অন্যান্য ওজোন ক্ষয়কারী গ্যাসের ব্যবহার কমানোর জন্য এই চুক্তিতে একমত হয়। এটি পরিবেশ রক্ষায় এ যাবতকালের সবচেয়ে সফল আন্তর্জাতিক চুক্তি হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত ও প্রশংসিত। এই চুক্তির ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উৎপাদন অনেক দেশে বন্ধ হয়েছে এবং ওজোন স্তরের উন্নতি ঘটছে। প্রতি বছর ১৬ই সেপ্টেম্বর 'বিশ্ব ওজোন দিবস' পালনের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হয় সর্বত্র। বর্তমানে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে যা ওজোন স্তরের ওপর চাপ কমায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে এই সুরক্ষা কবজ রক্ষা করা অনেক সহজ হয়ে যাবে। প্রতিটি দেশের সরকার ও নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে পৃথিবীকে এই মহাজাগতিক বিপদ থেকে বাঁচাতে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্য বর্জন করা এবং বৃক্ষরোপণ বাড়ানো এখন আমাদের অন্যতম প্রধান সামাজিক দায়িত্ব। বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা এবং বিশ্বনেতাদের সদিচ্ছা ওজোন স্তর রক্ষায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

​১০. উপসংহার: আগামীর জন্য সুরক্ষিত পৃথিবী

ওজোন স্তর হলো ধরিত্রীর এমন এক সম্পদ যা রক্ষা করার ওপর আমাদের অস্তিত্ব সরাসরি নির্ভরশীল। এটি কোনো বিলাসিতা নয় বরং মানবজাতির টিকে থাকার জন্য এক চরম ও পরম আবশ্যিকতা। আধুনিকতার নামে আমরা যেন আমাদের নিজের মাথার ওপরের ছাতাটি নিজেই ধ্বংস না করি সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আগামী প্রজন্মের কাছে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের নৈতিক ও আবশ্যিক দায়িত্ব। ওজোন স্তরের এই মহাজাগতিক ছাতাটি মেরামত হলে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাও অনেক সহজ হবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আমাদের টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলা এখন সময়ের দাবি। আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি যে বায়ুমণ্ডলকে দূষণমুক্ত রাখব এবং ওজোন স্তরকে সুরক্ষা দেব। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও জীবনযাত্রা গ্রহণের মাধ্যমেই আমরা এই অদৃশ্য ঢালটিকে অটুট রাখতে পারি চিরকাল। সূর্যের উপকারী আলো গ্রহণ করে ক্ষতিকর বিকিরণ বর্জনের এই ব্যবস্থাটি যেন অক্ষুণ্ণ থাকে সর্বদা। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের জয়গান গাইতে ওজোন স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। সচেতনতাই আমাদের এই যুদ্ধে জয়ের প্রধান হাতিয়ার এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর আশার প্রধান উজ্জ্বল এক প্রদীপ।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url